সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা শরীআতের কড়া নির্দেশ; রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুর আগেও এর দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন

একসঙ্গে চার বিয়ে সুন্নাত বা সওয়াবের কাজ নয়, এটি শর্তসাপেক্ষে জায়েজ: মাওলানা তাহমিদুল মাওলা



একসঙ্গে চার বিয়ে সুন্নাত বা সওয়াবের কাজ নয়, এটি শর্তসাপেক্ষে জায়েজ: মাওলানা তাহমিদুল মাওলা

এক সাথে চার বিয়ে করা কোনো সুন্নাত বা সওয়াবের কাজ নয়, বরং এটি কেবলই শর্ত সাপেক্ষে ইসলামে জায়েজ বা বৈধ করা হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে বিশিষ্ট আলেম, লেখক ও গবেষক মাওলানা তাহমিদুল মাওলা এই মন্তব্য করেন। দ্বীনি গবেষণা ও দাওয়াতি প্রতিষ্ঠান 'মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ' (MIBD)-এর ফেসবুক পেজে পূর্বের প্রকাশিত এই বক্তব্যটি বর্তমান সময়ে এসে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আমাদের সমাজে বহুবিবাহ বা একাধিক বিয়ে নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই চার বিয়ে করাকে সুন্নাত বা বাড়তি সওয়াবের কাজ মনে করে থাকেন। এই ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন দেশের অন্যতম আলেম ও গবেষক মাওলানা তাহমিদুল মাওলা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি ভিডিও বক্তব্য নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি মূলত ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ‘মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ’ (MIBD) নামক একটি দ্বীনি গবেষণা ও দাওয়াতি প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

সুন্নাত নয়, শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ

ভিডিওতে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "এক সাথে চার স্ত্রী রাখা সুন্নাত নয়। অর্থাৎ, সুন্নাত বলতে আমরা সাধারণ অর্থে যা বুঝি—যে কাজে বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে বা যা করলে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং ইসলামে এক সাথে চারজন স্ত্রী রাখা সম্পূর্ণ শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ বা অনুমোদিত।"

সমতা রক্ষার কঠিন শর্ত ও শরিয়তের বিধান

তিনি ধর্মীয় বিধানের গভীরতা বিশ্লেষণ করে বলেন, ইসলামী শরিয়তের মূল শর্ত হলো সমতা। যাদের একাধিক স্ত্রী আছে, তাদের প্রতিটি স্ত্রীর সাথে আচরণ, ভরণপোষণ এবং সময়ের ক্ষেত্রে পূর্ণ সমতা রক্ষা করতে হবে। শরিয়তের অকাট্য বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি এক স্ত্রীর কাছে ৭ দিন সময় কাটায়, তবে অন্য স্ত্রীর কাছেও তাকে সমানভাবে ৭ দিনই অবস্থান করতে হবে। এখানে বিন্দুমাত্র বৈষম্য করার সুযোগ নেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের দৃষ্টান্ত

বক্তব্যে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ দিনগুলোর এক অনন্য ও আবেগঘন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) মৃত্যুর আগে চরম অসুস্থ থাকা অবস্থাতেও স্ত্রীদের প্রতি সমতা রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক ছিলেন। তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও প্রতিদিন নিয়ম মেনে যার যার পালা ছিল, তাকে সেই স্ত্রীর ঘরেই নিয়ে যাওয়া হতো।

বুখারি শরিফের নির্ভরযোগ্য হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, শয্যাশায়ী অবস্থায়ও আল্লাহর রাসূল (সা.) বারবার জানতে চাইতেন, ‘আইনি আনা গাদান’—অর্থাৎ "কালকে আমার কোন স্ত্রীর ঘরে থাকার পালা?" এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্ত্রীদের মাঝে সমতা রক্ষা করা কতটা বাধ্যতামূলক এবং এটি অবহেলা করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। সমতা বজায় রাখতে না পারলে একাধিক বিয়ে করার অনুমতি ইসলাম দেয় না।

সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সমতা নিশ্চিত না করে বহুবিবাহের কারণে বহু পরিবারে নারী ও শিশুরা চরম বৈষম্য, মানসিক নির্যাতন ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন। মাওলানা তাহমিদুল মাওলার এই বিশ্লেষণটি মুসলিম সমাজকে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত থেকে বের হয়ে ধর্মীয় আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে চিন্তা করতে এবং নারীদের অধিকার সুরক্ষায় পুরুষদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সজাগ করবে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে বহুবিবাহ নিয়ে নানাবিধ সামাজিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এবং সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ধর্মীয় খোলসে আইনি ও মানবিক সমতা লঙ্ঘন করে বহুবিবাহের যে প্রবণতা সমাজে রয়েছে, তা নিরসনে এই ধরনের তাত্ত্বিক আলেমদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ধর্মীয় বিধানের খণ্ডিত ব্যাখ্যা অনেক সময় পারিবারিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনে। মাওলানা তাহমিদুল মাওলার এই দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য সমাজে বহুবিবাহের নামে নারীদের অধিকার হরণ রোধে এবং ইসলামের প্রকৃত ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপটি তুলে ধরতে সহায়ক হবে।

বিষয় : বহুবিবাহ

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬


একসঙ্গে চার বিয়ে সুন্নাত বা সওয়াবের কাজ নয়, এটি শর্তসাপেক্ষে জায়েজ: মাওলানা তাহমিদুল মাওলা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

featured Image

এক সাথে চার বিয়ে করা কোনো সুন্নাত বা সওয়াবের কাজ নয়, বরং এটি কেবলই শর্ত সাপেক্ষে ইসলামে জায়েজ বা বৈধ করা হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে বিশিষ্ট আলেম, লেখক ও গবেষক মাওলানা তাহমিদুল মাওলা এই মন্তব্য করেন। দ্বীনি গবেষণা ও দাওয়াতি প্রতিষ্ঠান 'মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ' (MIBD)-এর ফেসবুক পেজে পূর্বের প্রকাশিত এই বক্তব্যটি বর্তমান সময়ে এসে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আমাদের সমাজে বহুবিবাহ বা একাধিক বিয়ে নিয়ে বিভিন্ন ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই চার বিয়ে করাকে সুন্নাত বা বাড়তি সওয়াবের কাজ মনে করে থাকেন। এই ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন দেশের অন্যতম আলেম ও গবেষক মাওলানা তাহমিদুল মাওলা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার একটি ভিডিও বক্তব্য নতুন করে ভাইরাল হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি মূলত ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ‘মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশ’ (MIBD) নামক একটি দ্বীনি গবেষণা ও দাওয়াতি প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।

সুন্নাত নয়, শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ

ভিডিওতে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "এক সাথে চার স্ত্রী রাখা সুন্নাত নয়। অর্থাৎ, সুন্নাত বলতে আমরা সাধারণ অর্থে যা বুঝি—যে কাজে বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে বা যা করলে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে, বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। বরং ইসলামে এক সাথে চারজন স্ত্রী রাখা সম্পূর্ণ শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ বা অনুমোদিত।"

সমতা রক্ষার কঠিন শর্ত ও শরিয়তের বিধান

তিনি ধর্মীয় বিধানের গভীরতা বিশ্লেষণ করে বলেন, ইসলামী শরিয়তের মূল শর্ত হলো সমতা। যাদের একাধিক স্ত্রী আছে, তাদের প্রতিটি স্ত্রীর সাথে আচরণ, ভরণপোষণ এবং সময়ের ক্ষেত্রে পূর্ণ সমতা রক্ষা করতে হবে। শরিয়তের অকাট্য বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি এক স্ত্রীর কাছে ৭ দিন সময় কাটায়, তবে অন্য স্ত্রীর কাছেও তাকে সমানভাবে ৭ দিনই অবস্থান করতে হবে। এখানে বিন্দুমাত্র বৈষম্য করার সুযোগ নেই।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের দৃষ্টান্ত

বক্তব্যে মাওলানা তাহমিদুল মাওলা মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের শেষ দিনগুলোর এক অনন্য ও আবেগঘন দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নবী করীম (সা.) মৃত্যুর আগে চরম অসুস্থ থাকা অবস্থাতেও স্ত্রীদের প্রতি সমতা রক্ষার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক ছিলেন। তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও প্রতিদিন নিয়ম মেনে যার যার পালা ছিল, তাকে সেই স্ত্রীর ঘরেই নিয়ে যাওয়া হতো।

বুখারি শরিফের নির্ভরযোগ্য হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, শয্যাশায়ী অবস্থায়ও আল্লাহর রাসূল (সা.) বারবার জানতে চাইতেন, ‘আইনি আনা গাদান’—অর্থাৎ "কালকে আমার কোন স্ত্রীর ঘরে থাকার পালা?" এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্ত্রীদের মাঝে সমতা রক্ষা করা কতটা বাধ্যতামূলক এবং এটি অবহেলা করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। সমতা বজায় রাখতে না পারলে একাধিক বিয়ে করার অনুমতি ইসলাম দেয় না।

সামাজিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, সমতা নিশ্চিত না করে বহুবিবাহের কারণে বহু পরিবারে নারী ও শিশুরা চরম বৈষম্য, মানসিক নির্যাতন ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হন। মাওলানা তাহমিদুল মাওলার এই বিশ্লেষণটি মুসলিম সমাজকে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত থেকে বের হয়ে ধর্মীয় আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে চিন্তা করতে এবং নারীদের অধিকার সুরক্ষায় পুরুষদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সজাগ করবে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে বহুবিবাহ নিয়ে নানাবিধ সামাজিক ও আইনি বিতর্ক রয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, প্রথম স্ত্রীর অনুমতি এবং সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা দণ্ডনীয় অপরাধ। ধর্মীয় খোলসে আইনি ও মানবিক সমতা লঙ্ঘন করে বহুবিবাহের যে প্রবণতা সমাজে রয়েছে, তা নিরসনে এই ধরনের তাত্ত্বিক আলেমদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ধর্মীয় বিধানের খণ্ডিত ব্যাখ্যা অনেক সময় পারিবারিক ও সামাজিক বিপর্যয় ডেকে আনে। মাওলানা তাহমিদুল মাওলার এই দায়িত্বশীল ও তথ্যভিত্তিক বক্তব্য সমাজে বহুবিবাহের নামে নারীদের অধিকার হরণ রোধে এবং ইসলামের প্রকৃত ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপটি তুলে ধরতে সহায়ক হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ