ভারতের উত্তর প্রদেশের (ইউপি) কানপুরে একটি সরকারি হাসপাতালে হিজাব পরার কারণে এক মুসলিম নারীকে ওষুধ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ভুক্তভোগী নারী উরসুলা হরম্যান মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্যমূলক আচরণের দাবি করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই অদ্ভুত নিয়মের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরের উরসুলা হরম্যান মেমোরিয়াল হাসপাতালে এক অনাকাঙ্ক্ষী ও বিতর্কিত ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। হিজাব পরিহিত এক মুসলিম নারীকে ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছেন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে ভুক্তভোগী নারী জানান, তিনি টোকেন নম্বর পাওয়ার পর দীর্ঘ আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। যখন তার ওষুধ নেওয়ার সময় আসে, তখন দুই নারী চিকিৎসক তাকে সাফ জানিয়ে দেন, "যদি ওষুধ নিতে চান, তবে আপনাকে হিজাব খুলতে হবে।" চিকিৎসকদের দাবি, হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা চুরি রোধে এই "নিরাপত্তা নিয়ম" চালু করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর যৌক্তিক প্রশ্ন ও ক্ষোভ
হাসপাতালের এই ভিত্তিহীন নিয়মের তীব্র বিরোধিতা করে ওই নারী বলেন, “করোনা বা সুরক্ষার জন্য মাস্ক খুলতে বললে তা বোঝা যায় এবং তা যৌক্তিক। কিন্তু হিজাব খোলার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে? চিকিৎসকেরা দাবি করছেন এখানে নাকি খুব চুরি হয়। তারা কি ভাবছেন আমি মাথার হিজাবের ভেতরে পার্স লুকিয়ে রাখব (নিজের মাথার দিকে ইঙ্গিত করে)?”
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি হাসাপাতালে চুরি হয়েই থাকে, তবে তার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? সব জায়গায় যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে, সেখানে তাদের কিসের এত ভয়?”
সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ
ভুক্তভোগী হিজাবি নারী অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করেন যে, চিকিৎসকেরা কেবল মুসলিম নারীদেরই টার্গেট করছেন। তিনি বলেন, “হিন্দু মেয়ে এবং নারীরা সবাই স্বাভাবিকভাবে ভেতরে যাতায়াত করছেন এবং ওষুধ পাচ্ছেন। তাহলে কেন শুধু মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে? হিজাব খোলার এই নতুন নিয়ম শুধুমাত্র আমাদের জন্যই কেন?”
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী জানিয়েছেন, তিনি এই অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন নিয়মের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবেন এবং এর সুষ্ঠু বিচার চাইবেন।
ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার রয়েছে। চিকিৎসা পাওয়ার মতো মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে পোশাক বা ধর্মীয় অনুষঙ্গকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
হাসপাতালে চুরির ঘটনা প্রতিরোধের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নিরাপত্তা রক্ষী থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় পোশাককে লক্ষ্যবস্তু করা এবং এর মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা পেশাগত আচরণবিধির পরিপন্থী। এই ঘটনাটি সরকারি পরিষেবা খাতে সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সম-অধিকার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের জবাবদিহিতাকে পুনরায় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো নাগরিক যেন ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
ভারতের উত্তর প্রদেশের (ইউপি) কানপুরে একটি সরকারি হাসপাতালে হিজাব পরার কারণে এক মুসলিম নারীকে ওষুধ দিতে অস্বীকৃতি জানানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে ভুক্তভোগী নারী উরসুলা হরম্যান মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে এই বৈষম্যমূলক আচরণের দাবি করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই অদ্ভুত নিয়মের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুর শহরের উরসুলা হরম্যান মেমোরিয়াল হাসপাতালে এক অনাকাঙ্ক্ষী ও বিতর্কিত ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। হিজাব পরিহিত এক মুসলিম নারীকে ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছেন হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে ভুক্তভোগী নারী জানান, তিনি টোকেন নম্বর পাওয়ার পর দীর্ঘ আধ ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। যখন তার ওষুধ নেওয়ার সময় আসে, তখন দুই নারী চিকিৎসক তাকে সাফ জানিয়ে দেন, "যদি ওষুধ নিতে চান, তবে আপনাকে হিজাব খুলতে হবে।" চিকিৎসকদের দাবি, হাসপাতালে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা চুরি রোধে এই "নিরাপত্তা নিয়ম" চালু করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর যৌক্তিক প্রশ্ন ও ক্ষোভ
হাসপাতালের এই ভিত্তিহীন নিয়মের তীব্র বিরোধিতা করে ওই নারী বলেন, “করোনা বা সুরক্ষার জন্য মাস্ক খুলতে বললে তা বোঝা যায় এবং তা যৌক্তিক। কিন্তু হিজাব খোলার পেছনে কী যুক্তি থাকতে পারে? চিকিৎসকেরা দাবি করছেন এখানে নাকি খুব চুরি হয়। তারা কি ভাবছেন আমি মাথার হিজাবের ভেতরে পার্স লুকিয়ে রাখব (নিজের মাথার দিকে ইঙ্গিত করে)?”
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি হাসাপাতালে চুরি হয়েই থাকে, তবে তার সাথে আমাদের কী সম্পর্ক? সব জায়গায় যেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে, সেখানে তাদের কিসের এত ভয়?”
সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ
ভুক্তভোগী হিজাবি নারী অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে অভিযোগ করেন যে, চিকিৎসকেরা কেবল মুসলিম নারীদেরই টার্গেট করছেন। তিনি বলেন, “হিন্দু মেয়ে এবং নারীরা সবাই স্বাভাবিকভাবে ভেতরে যাতায়াত করছেন এবং ওষুধ পাচ্ছেন। তাহলে কেন শুধু মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছে? হিজাব খোলার এই নতুন নিয়ম শুধুমাত্র আমাদের জন্যই কেন?”
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারী জানিয়েছেন, তিনি এই অযৌক্তিক এবং ভিত্তিহীন নিয়মের বিরুদ্ধে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলবেন এবং এর সুষ্ঠু বিচার চাইবেন।
ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার রয়েছে। চিকিৎসা পাওয়ার মতো মৌলিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে পোশাক বা ধর্মীয় অনুষঙ্গকে শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া নাগরিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
হাসপাতালে চুরির ঘটনা প্রতিরোধের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা এবং নিরাপত্তা রক্ষী থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় পোশাককে লক্ষ্যবস্তু করা এবং এর মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা পেশাগত আচরণবিধির পরিপন্থী। এই ঘটনাটি সরকারি পরিষেবা খাতে সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সম-অধিকার নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে প্রশাসনের জবাবদিহিতাকে পুনরায় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে কোনো নাগরিক যেন ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন স্থানীয় প্রশাসনের প্রধান কর্তব্য হওয়া উচিত।

আপনার মতামত লিখুন