প্রকাশের তারিখ : ২৪ নভেম্বর ২০২৫
নামাজ পড়ায় মুসলিম ছাত্রদের মূর্তির পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাওয়ালো হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী
মহারাষ্ট্রের থানে জেলার কল্যানের আইডিয়াল কলেজে তিন মুসলিম ছাত্রকে নামাজ পড়ার জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) ও বজরং দলের সদস্যদের দ্বারা জবরদস্তিভাবে মূর্তির পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো এবং শারীরিক হেনস্তার ঘটনায় রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এই জনসমক্ষে হয়রানির সময় পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলিকে থামানোর কোনো চেষ্টা করেননি। এমনকি, কলেজ কর্তৃপক্ষ এখন শিকার হওয়া ওই ছাত্রদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।কলেজের একটি খালি শ্রেণীকক্ষে তিন মুসলিম ছাত্রের নামাজ পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পরই ভিএইচপি এবং বজরং দলের সদস্যরা কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তারা ছাত্রদের বিরুদ্ধে 'হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করার' অভিযোগ তোলে এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানায়। ছাত্রদের একজন সংবাদমাধ্যমকে জানান, তারা কাউকে বিরক্ত করতে বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ভাঙতে চাননি, শুধু কয়েক মিনিটের জন্য একটি ফাঁকা ঘরে প্রার্থনা করছিলেন।পরিস্থিতি শান্তভাবে মেটানোর বদলে তা ভয়াবহ জন-অপমানে পরিণত হয়। দ্বিতীয় একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সদস্যরা ওই তিন মুসলিম ছাত্রকে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের মূর্তির সামনে ওঠবস করতে এবং ক্ষমা চাইতে বাধ্য করছে। অভিযুক্তরা ছাত্রদের উপর চড়াও হয়ে চিৎকার করে এবং জবরদস্তিভাবে তাদের মূর্তির পায়ে হাত দিতে বাধ্য করে। ভীত সন্ত্রস্ত ছাত্ররা তা করার সঙ্গে সঙ্গেই ভিড়ের মধ্যে থেকে "জয় শ্রী রাম" স্লোগান শোনা যায়।ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা হিন্দুত্ববাদী কর্মীদের এই জবরদস্তি থামাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। স্থানীয় এক মুসলিম বাসিন্দা বলেন, "ওরা বাচ্চাদের অপরাধীর মতো ব্যবহার করছিল। পুলিশ দাঁড়িয়ে দেখছিল। এটা আইন নয়, এটা সরাসরি ধমকানো।" ভুক্তভোগী ছাত্রদের এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমার ছেলেকে মূর্তির সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করা হয়েছে। এটা ক্ষমা চাওয়ানো নয়, এটা চরম অপমান। পুলিশের উচিত ছিল তাদের রক্ষা করা।"পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর আইডিয়াল কলেজ প্রশাসন এটিকে "অভ্যন্তরীণ বিষয়" বলে উল্লেখ করে এবং নিজেরাই পরিস্থিতি সামলানোর কথা জানায়। ছাত্ররা নিয়ম লঙ্ঘনের অভিপ্রায় না থাকার কথা জানিয়ে প্রশাসনের কাছে ক্ষমাও চায়। কিন্তু ভিএইচপি এবং বজরং দলের সদস্যরা আবারও মূর্তির সামনে ক্যামেরার সামনে ছাত্রদের ক্ষমা চাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে।আরও উদ্বেগজনকভাবে, জনসমক্ষে এত বড় হয়রানির শিকার হওয়ার পরও কলেজ কর্তৃপক্ষ উল্টো ওই ভুক্তভোগী ছাত্রদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একজন কলেজ কর্মকর্তা জানান, "ক্যাম্পাসে ধর্মীয় কার্যকলাপ অনুমোদিত নয়। নিয়ম না মানলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" মুসলিম অভিভাবকরা মনে করছেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের সুরক্ষা না দিয়ে বরং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলির চাপে কাজ করছে।মুম্বাইয়ের মুসলিম সামাজিক কর্মীরা বলছেন, কল্যানের এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর লক্ষ্যবস্তু করার পদ্ধতির অংশ। সম্প্রতি পুনেতে মুসলিম মহিলাদের নামাজ-এর পর বিজেপি সাংসদ মেধা কুলকার্নি একটি দুর্গের অভ্যন্তরে গোমূত্র ছিটিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ উল্টো নামাজ পড়া মহিলাদের বিরুদ্ধেই এফআইআর দায়ের করেছিল। মুসলিম সমাজ এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ন্যায্য তদন্ত, ছাত্রদের হয়রানিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং মুসলিম ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত