প্রকাশের তারিখ : ১০ জানুয়ারি ২০২৬
উইঘুর মুসলিমদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় অনুভূতি দমনে অভিনব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে চীন
চীনের শিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রকাশের ওপর নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ গানের তালিকা তৈরি করে সেগুলো শোনা, সংরক্ষণ বা অনলাইনে শেয়ার করাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—এই নীতির ফলে বহু উইঘুর নাগরিক গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ ও কারাদণ্ডের মুখে পড়ছেন।অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা Uyghur Hjelp–এর সংগৃহীত নথি ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে, শিনজিয়াংয়ে তথাকথিত ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘সমস্যাজনক’ গানের একটি তালিকা কার্যকর করা হয়েছে। এই তালিকায় থাকা গানগুলো ৭টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে সেগুলো না শোনা, না ডাউনলোড করা এবং অনলাইনে শেয়ার না করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে কাশগর শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি বৈঠকের রেকর্ডে দেখা যায়, নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সতর্কবার্তায় বলা হয়, এসব গান সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে ‘গুরুতর বিচারিক প্রক্রিয়া’ ও কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে, যদিও নির্দিষ্ট শাস্তির মাত্রা উল্লেখ করা হয়নি।ওই বৈঠকে আরও নির্দেশনা দেওয়া হয়—স্থানীয় কর্মকর্তারা যেন দৈনন্দিন কথোপকথনে “আসসালামু আলাইকুম” বা “আল্লাহ হাফেজ” ধরনের ধর্মীয় সম্ভাষণ ব্যবহার না করেন; বরং “কমিউনিস্ট পার্টি আপনাকে রক্ষা করুক”—এ ধরনের বাক্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়।নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছে জনপ্রিয় উইঘুর লোকগীতি “বেশ পেদে”, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়ে আসছে। প্রেমিক যুবকের ঈশ্বরের কাছে সুখ ও স্বপ্নের প্রার্থনা নিয়ে রচিত এই গানটিকে ‘ধর্মীয় উপাদান’ থাকার অভিযোগে সমস্যাজনক বলা হয়েছে।এছাড়া কারাবন্দি উইঘুর কবি আবদুলকাদির জালালউদ্দিন–এর কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত গান “ইয়ানারিম ইয়োক”, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিভা অন্বেষণ অনুষ্ঠান Silk Road Voice–এ পরিবেশিত “এস-সেলামু আলাইকুম”, এবং খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞ আবদুররহিম হেইত–এর রচিত “আতালার” গানটিও তালিকাভুক্ত।লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের SOAS–এর নৃসঙ্গীতবিদ্যা অধ্যাপক র্যাচেল হ্যারিস বলেন, “‘বেশ পেদে’তে ধর্মীয় ভাষা থাকলেও তা চরমপন্থা উসকে দেয় না। মূল সমস্যা হলো—এ ধরনের ঈশ্বরপ্রেমমূলক প্রকাশ।” তিনি আরও বলেন, “আতালার” গানটিতে উইঘুর পূর্বপুরুষদের সংগ্রামী চেতনা তুলে ধরা হয়েছে বলেই সেটিকে জাতীয়তাবাদী ও ‘সমস্যাজনক’ আখ্যা দেওয়া হতে পারে।এপি জানায়, তারা এমন বহু পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে যাদের সদস্যরা উইঘুর সংগীত শোনা বা শেয়ার করার কারণে আটক হয়েছেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২৭ বছর বয়সী উইঘুর সঙ্গীত প্রযোজক ইয়াশার শিয়াওহেলাইতি–কে ২০২৩ সালে বোলে শহরে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ—তিনি ৪২টি ‘সমস্যাজনক’ গান লিখে সেগুলো চীনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম NetEase Cloud Music–এ আপলোড করেছিলেন এবং ৮টি ‘সমস্যাজনক’ ই-বুক ডাউনলোড করেছিলেন। আদালত তাকে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ৩ হাজার ইউয়ান জরিমানা দেয়।এক সাবেক স্থানীয় কর্মকর্তা জানান, শুধু WeChat–এ একে অপরকে উইঘুর গান পাঠানোর কারণেও দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, বিদেশে থাকা এক উইঘুরের পোস্টে মন্তব্য করার পর তাকেও পুলিশ স্টেশনে ডেকে নেওয়া হয়।লন্ডনপ্রবাসী উইঘুর শিল্পী ও অধিকারকর্মী রাহিমা মাহমুদ বলেন, “সংগীত আমার পরিচয়ের অংশ। সংগীত মুছে ফেলা মানে আমাদের আত্মাকেই মুছে ফেলা।”চীন সরকার ১৯৪৯ সালে গৃহযুদ্ধের পর শিনজিয়াংয়ের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং ১৯৫৫ সালে অঞ্চলটিকে ‘উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল’ ঘোষণা করে। যদিও এটি চীনের পাঁচটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের একটি, বাস্তবে এখানকার শীর্ষ কর্মকর্তারা কেন্দ্রীয় কমিউনিস্ট পার্টির দ্বারা নিয়োজিত হওয়ায় প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন সীমিত।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত