প্রকাশের তারিখ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
গাজায় ইসরায়েলি 'ক্ষুধা নীতি': চার প্রজন্ম পর্যন্ত বয়ে বেড়াতে হতে পারে ভয়াবহ মানসিক ক্ষত
গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘকালীন অবরোধ, পরিকল্পিত অনাহার এবং নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ কেবল বর্তমান ভুক্তভোগীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর মানসিক ক্ষত ছড়িয়ে পড়ছে পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতিতে। প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সামাহ জাবর সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই পদ্ধতিগত অনাহার বা 'স্টারভেশন পলিসি' এমন এক মানসিক ট্রমা তৈরি করছে যা পরবর্তী তিন থেকে চার প্রজন্ম পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এটি এখন ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত স্মৃতির এক গভীর ক্ষত।ফিলিস্তিনের বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ডা. সামাহ জাবর সম্প্রতি তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনদোলুকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে গাজার বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, গাজায় যা ঘটছে তা কেবল যুদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত 'ঔপনিবেশিক ট্রমা' (Colonial Trauma), যা মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছা ও সামাজিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।ডা. জাবর উল্লেখ করেন যে, ইতিহাস থেকে দেখা গেছে বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ বা অনাহার কেবল এক প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। আয়ারল্যান্ড এবং চীনের মহাদুর্ভিক্ষের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যারা অনাহারের শিকার হন, তাদের সন্তানদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা, সামাজিক ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোজন অক্ষমতা এবং বিষণ্নতার হার অনেক বেশি থাকে। গাজার শিশুদের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তাদের খাদ্য, অর্থ এবং নিরাপত্তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বদলে যাচ্ছে।২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া তীব্র হামলার প্রথম কয়েক সপ্তাহেই গাজার ভঙ্গুর মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। ডা. জাবর জানান, তার অনেক সহকর্মী চিকিৎসক নিহত হয়েছেন অথবা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যারা বেঁচে আছেন, তারা ক্ষুধার যন্ত্রণায় এতটাই কাতর যে রোগীদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়েছেন। তিনি তার এক সহকর্মী চিকিৎসক মোহাম্মদ সাঈদ কাহলুতের কথা উল্লেখ করেন, যিনি নিজের খাবার কমিয়ে সন্তানদের মুখে তুলে দিচ্ছেন। ডা. জাবর বলেন, "যখন একজন থেরাপিস্ট নিজেই ক্ষুধার্ত থাকেন, তখন তিনি কেবল শারীরিক শক্তিই হারান না, বরং অন্যের কথা শোনার মানসিক ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন।"যদিও যুদ্ধবিরতি বা সাময়িক স্থিতাবস্থার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু ডা. জাবরের মতে, গাজায় মানবিক দুর্দশা শেষ হয়নি। তীব্র শীত, খাদ্যাভাব এবং ওষুধহীনতায় মানুষ এখনও ধুঁকে ধুঁকে মরছে। বিশেষ করে হাইপোথার্মিয়া (শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া) এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন ডায়াবেটিস বা কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুর হার বাড়ছে।এই ট্রমা কেবল গাজার ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও এক ধরনের অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর বিচারহীনতা এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের উদাসীনতা ফিলিস্তিনিদের মনে এই ধারণা গেঁথে দিয়েছে যে, তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গুরুত্বের বাইরে।ডা. সামাহ জাবর তার বিশ্লেষণের শেষে বলেন, ক্ষুধা কেবল শরীরকে আক্রমণ করে না, এটি মানুষের স্মৃতি এবং আত্মপরিচয়কেও আঘাত করে। যখন আগামী প্রজন্মের শিশুরা জানবে তাদের পূর্বপুরুষদের পরিকল্পিতভাবে না খাইয়ে রাখা হয়েছিল, তখন তাদের ভবিষ্যতের প্রতি অনিশ্চয়তা এবং অনিরাপদ বোধ আরও বাড়বে।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত