প্রকাশের তারিখ : ২১ মার্চ ২০২৬
ইফতারের অবশিষ্টাংশ ফেলার অভিযোগে চার মুসলিম যুবক গ্রেফতার
ভারতের উত্তরপ্রদেশের শ্রাবস্তি জেলায় একটি মন্দিরের নিকটবর্তী নালায় ইফতারের খাবারের অবশিষ্টাংশ ফেলার অভিযোগে চার মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করেছে স্থানীয় পুলিশ। গত শুক্রবার (২০ মার্চ) সির্সিয়া এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। পবিত্র রমজান মাসে আয়োজিত একটি ইফতার মাহফিলের পর উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ এই কঠোর পদক্ষেপ নেয়।স্থানীয় সোনপাথরি আশ্রম মন্দিরের প্রধান হরি শরণানন্দ গত ১৯ মার্চ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তার দাবি অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ আশ্রমের পাশের একটি স্বচ্ছ পানির নালায় ইফতারের পর আমিষ খাবারের অবশিষ্টাংশ ফেলা হয়। অভিযোগকারী উল্লেখ করেন, "আশ্রমের ভক্তরা রান্নাবান্না, পানীয় জল এবং মূর্তিপূজার পবিত্র কাজের জন্য এই নালার পানির ওপর নির্ভরশীল। খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলে এই পানির পবিত্রতা নষ্ট করা হয়েছে।" তিনি আরও দাবি করেন, বাধা দিতে গেলে আয়োজকরা তাকে হুমকি প্রদর্শন করেন। সার্কেল অফিসার সতীশ কুমার শর্মা এক ভিডিও বার্তায় জানান, "ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার আশঙ্কায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে।"ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরপ্রদেশের শ্রাবস্তি জেলার সির্সিয়া থানার অন্তর্গত সোনপাথরি আশ্রম সংলগ্ন এলাকায়। মাহরু মূর্তিয়া গ্রামের বাসিন্দা জামাল আহমদ, ইরফান আহমদ, ইমরান আহমদ এবং জহির খান সেখানে একটি ইফতার মজলিসের আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে খাবারের অবশিষ্টাংশ পাশের একটি নালায় ফেলা হয়। ১৯ মার্চ অভিযোগ দায়েরের পর ২০ মার্চ শুক্রবার পুলিশ ওই চার যুবককে গ্রেফতার করে।ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় মুসলিমদের ওপর এই ঘটনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। রমজানের ইবাদত-বন্দেগির সময়ে চারজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তির গ্রেফতারে পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এটি একটি অনিচ্ছাকৃত পরিচ্ছন্নতা সংক্রান্ত বিষয় হতে পারলেও তাকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এই ঘটনার রেশ ধরে বারানসিতেও গঙ্গা নদীতে নৌকায় ইফতার করার অভিযোগে ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা রাজ্যের মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে এক ধরণের আইনি ভীতি ও সামাজিক চাপের সৃষ্টি করছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে, তবে তা জনস্বাস্থ্য ও শৃঙ্খলার পরিপন্থী হওয়া চলবে না। এই ঘটনায় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার দায়বদ্ধতা যেমন আয়োজকদের ছিল, তেমনি একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরাসরি 'শত্রুতা সৃষ্টি'র মতো গুরুতর ধারায় মামলা ও গ্রেফতার কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা।মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, সামান্য বর্জ্য অপসারণের বিষয়টিকে সাম্প্রদায়িক রঙ দিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা সামাজিক মেরুকরণকে আরও উসকে দিতে পারে। কোনো পক্ষই যেন উস্কানিমূলক আচরণ না করে এবং পুলিশি তদন্ত যেন রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে। নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কেবল গ্রেফতার নয়, বরং উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংলাপ ও ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। দায়বদ্ধতা কেবল একপক্ষের নয়, বরং শান্তি বজায় রাখা প্রশাসন ও নাগরিক সমাজ—উভয় পক্ষেরই সম্মিলিত দায়িত্ব।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত