প্রকাশের তারিখ : ২৭ মার্চ ২০২৬
চতুর্থ সপ্তাহের মতো অবরুদ্ধ আল-আকসা: জুমার নামাজ আদায়ে ইসরাইলি নিষেধাজ্ঞা
দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ঐতিহাসিক মাসজিদুল আকসায় টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো জুমার নামাজ আদায়ে বাধা প্রদান করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। গত ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা 'জরুরি অবস্থা'র অজুহাতে এই পবিত্র স্থাপনাটি মুসলিম মুসল্লিদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে আল-আকসা প্রাঙ্গণ এখন মুসল্লিহীন এক জনশূন্য প্রান্তরে পরিণত হয়েছে।ইসরাইলি সরকার এবং দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী (আইডিএফ) আল-আকসা বন্ধ রাখার পেছনে প্রধানত 'নিরাপত্তা ঝুঁকি' এবং 'জরুরি অবস্থা'কে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলের অভ্যন্তরে 'হোম ফ্রন্ট কমান্ড' জনসমাগমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।কর্তৃপক্ষের দাবি, ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার মুখে বড় ধরনের জনসমাগম নাগরিকদের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই যুক্তি দেখিয়ে তারা কেবল আল-আকসা নয়, বরং খ্রিস্টানদের পবিত্র গির্জা 'চার্চ অফ দ্য হলি সেপালকার'-ও বন্ধ করে দিয়েছে। গত ২৫ মার্চ ইসরাইলি সরকার এই জরুরি অবস্থার মেয়াদ আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে রমজান ও পরবর্তী ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।২৭ মার্চ ২০২৬, শুক্রবার জেরুজালেমের রাজপথ ছিল ইসরাইলি পুলিশের কঠোর পাহারায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, জুমার নামাজের সময় হওয়ার আগেই ওল্ড সিটির প্রতিটি প্রবেশপথে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। তারা মুসল্লিদের আল-আকসা অভিমুখে যেতে বাধা দেয় এবং সালাহউদ্দিন স্ট্রিটসহ পার্শ্ববর্তী রাস্তাগুলো থেকে লোকজনকে সরিয়ে দেয়।সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে আল-আকসার দরজাগুলো সাধারণ মুসল্লিদের জন্য তালাবদ্ধ। বর্তমানে কেবল ইসলামিক ওয়াকফ-এর মুষ্টিমেয় কয়েকজন কর্মচারী ও প্রহরী ছাড়া আর কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না।রাস্তায় নামাজ: আল-আকসায় প্রবেশে ব্যর্থ হয়ে শত শত ফিলিস্তিনি ওল্ড সিটির দেয়ালের কাছে এবং সরু গলিগুলোতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করেন, কিন্তু সেখানেও পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়।ঐতিহাসিক বঞ্চনা: এই যুদ্ধের অজুহাতে চলতি বছর পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজও আল-আকসায় হতে দেওয়া হয়নি, যা ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবার ঘটল।জেরুজালেমের স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, ছোট ছোট মহল্লাভিত্তিক মসজিদে নামাজ পড়ার অনুমতি থাকলেও আল-আকসাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। তাদের মতে, যুদ্ধের দোহাই দিয়ে এটি একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, যে কোনো পরিস্থিতিতে ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশ এবং ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করছে, 'নিরাপত্তা নিশ্চিত করার' নামে একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে তাদের পবিত্রতম স্থান থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা কালেক্টিভ পানিশমেন্ট বা 'গণশাস্তি'র শামিল।১৯৬৭ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং 'স্ট্যাটাস কু' অনুযায়ী, আল-আকসার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জর্ডান ও ওয়াকফ প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত। ইসরাইলের একতরফা বন্ধের সিদ্ধান্ত এই ঐতিহাসিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা এর আগেও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছে।একটি টেকসই সমাধানের জন্য উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর এবং আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আল-আকসার পবিত্রতা রক্ষা এবং মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে ইবাদত করার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া মানবিক মর্যাদার দাবি।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত