প্রকাশের তারিখ : ৩১ মার্চ ২০২৬
সীতাপুরে ১২ বছরের পুরনো মসজিদ গুঁড়িয়ে দিল যোগী প্রশাসন
ভারতের উত্তরপ্রদেশের সীতাপুর জেলায় প্রশাসনের বুলডোজার অভিযানে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে ১২ বছরের পুরনো একটি মসজিদ। সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। প্রশাসনের দাবি, আইন মেনেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে এটি চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে 'সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) নীতিশ কুমারের দেওয়া তথ্যমতে, সীতাপুর জেলার লহড়পুর এলাকার নাইগাঁও বেহাতি গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদটি সরকারি জমিতে (যা নথিভুক্ত অনুযায়ী একটি পুকুর) অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল।স্থানীয় গ্রাম সভার অভিযোগের ভিত্তিতে গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে একটি মামলা দায়ের করা হয়। প্রশাসনের দাবি:২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি তহশিল আদালত নির্মাণটিকে অবৈধ ঘোষণা করে উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়।উত্তরপ্রদেশ রাজস্ব কোডের ৬৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী মসজিদের পক্ষকে একাধিক নোটিশ প্রদান করা হয়েছিল।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখলমুক্ত না করায় প্রশাসন বুলডোজার ব্যবহারে বাধ্য হয়েছে।
রাস্তার পাশে অবস্থানের কারণে যানজট এড়াতে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ভোর ৩টার সময়কে অভিযানের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।সোমবার রাত ৩টার দিকে প্রায় ৫০০ পুলিশ সদস্য এবং তিনটি বুলডোজার নিয়ে নাইগাঁও বেহাতি গ্রামে অতর্কিত হানা দেয় প্রশাসন। ১২ বছর ধরে নামাজ ও ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত মসজিদটি মুহূর্তের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।মসজিদ সংশ্লিষ্ট মাওলানা আব্দুল রহমান এই ঘটনাকে 'রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত' বলে মন্তব্য করেছেন, তবে পরিস্থিতির সংবেদনশীলতার কারণে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। স্থানীয় মুসল্লিদের দাবি, মসজিদটি দীর্ঘদিনের পুরনো এবং এটি উচ্ছেদের মাধ্যমে একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আবেগে আঘাত করা হয়েছে। হঠাৎ এই ধ্বংসযজ্ঞে ওই এলাকার মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযানের সময় পুরো এলাকাটি নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয়েছিল যাতে কেউ প্রতিবাদ করার সুযোগ না পায়। মসজিদটি ভেঙে ফেলায় এখন কয়েক শ’ মানুষের নামাজ আদায়ের স্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে যে, উত্তরপ্রদেশে 'বুলডোজার জাস্টিস' অভিযানগুলো প্রায়শই নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের স্বীয় ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। যদিও সরকারি জমি উদ্ধারের আইনি ভিত্তি থাকে, তবে ধর্মীয় উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময়, পুনর্বাসন বা বিকল্প ব্যবস্থার প্রশ্নটি মানবিক ও নাগরিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভোরের অন্ধকারে এই ধরণের অভিযান স্বচ্ছতার প্রশ্ন তোলে। পুকুর বা সরকারি জমি উদ্ধারের নাম করে শুধুমাত্র ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হওয়া কি কেবলই প্রশাসনিক তৎপরতা নাকি এর পেছনে গভীর কোনো বৈষম্য কাজ করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রশাসনের উচিত ছিল স্থানীয়দের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করা। এই সংকটময় মুহূর্তে শান্তি বজায় রেখে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া এবং কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত