প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬
তেলেঙ্গানায় হনুমান জয়ন্তীর মিছিলে মুসলিম পিতা-পুত্রকে অমানুষিক নির্যাতন
ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের জগতিয়াল জেলায় হনুমান জয়ন্তীর উৎসব চলাকালীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতার হাতে বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোহাম্মদ কোরেশি (৬০) এবং তার কিশোর পুত্র মোহাম্মদ আনাস (১৬)। গোমাংস বিক্রির কথিত অভিযোগে তাদের প্রকাশ্যে বিবস্ত্র করার চেষ্টা, মারধর এবং খুঁটিতে বেঁধে রাখার ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শুরু করলেও এখন পর্যন্ত মূল অভিযুক্তদের গ্রেফতার নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।অভিযুক্ত উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর দাবি, হনুমান জয়ন্তীর দিনে তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার উদ্দেশ্যে জনসমক্ষে গোমাংস বিক্রি করা হচ্ছিল। ঘটনাস্থলে ধারণকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, গেরুয়া পোশাকধারী ১৫-২০ জনের একটি দল "জয় শ্রী রাম" এবং "জয় শিবাজি" স্লোগান দিতে দিতে এই আক্রমণ চালায়। তাদের দাবি, উৎসবের দিনে এ ধরনের কর্মকাণ্ড উস্কানিমূলক। মেটপল্লী টাউন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (SDPO) জানিয়েছেন, "হনুমান জয়ন্তীতে গোমাংস বিক্রির ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আক্রমণ ও তর্কের সূত্রপাত হয়েছে।" পুলিশ সূত্রে আরও জানানো হয়েছে যে, তারা ঘটনার ভিডিও দেখে জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন এবং ইতিমধ্যে ৪-৫ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে।১ এপ্রিল, বুধবার তেলেঙ্গানার জগতিয়াল জেলার ইব্রাহিমপত্তনম থানার অন্তর্গত বর্ষাকোন্ডা গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী মোহাম্মদ কোরেশি এবং তার পুত্র আনাস মূলত নিজামবাদ থেকে মাংস সংগ্রহ করে গ্রামে সরবরাহ করেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, গেরুয়া পরিহিত উন্মত্ত জনতা কিশোর আনাসকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় এবং তার কাপড় খুলে ফেলার চিৎকার করতে থাকে। বৃদ্ধ পিতাকে মাটিতে ফেলে বুট জুতো দিয়ে লাথি ও কিল-ঘুষি মারা হয়।নির্যাতনের এক পর্যায়ে হামলাকারীদের একজনকে বলতে শোনা যায়, "বেশি জোরে মারিস না, মরে যেতে পারে। শরীরে যেন দাগ না থাকে।" আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কিশোর আনাসকে একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং তার আহত পিতা পাশে দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে গ্রামবাসীর নীরবতা প্রত্যক্ষ করছেন। পুলিশের উপস্থিতিতেও হামলাকারীরা "খবরদার, খবরদার" বলে হুমকি দিতে থাকে। আহত পিতা-পুত্রকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে পরবর্তীতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে।তেলেঙ্গানা ঐতিহাসিকভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত হলেও ২০২৬ সালের শুরু থেকে রাজ্যটিতে মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত ধারা ২১ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে এবং আইনের উর্ধ্বে গিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো গোষ্ঠীর নেই। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে 'মব লিঞ্চিং' বা গণপিটুনির একটি জঘন্য উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছে।আইনি কাঠামো অনুযায়ী, পুলিশ প্রশাসনের সামনে অপরাধীদের আস্ফালন এবং প্রকাশ্যে কিশোরকে খুঁটিতে বেঁধে রাখা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাকে ফুটিয়ে তোলে। নাগরিক সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ধরনের বিচারবহির্ভূত সহিংসতা বন্ধে স্বচ্ছ তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি সমাজে আরও অরাজকতা এবং বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত