প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
মাসজিদুল আকসা জবরদখলের অপচেষ্টা: ১১৮৭ সালের পর দীর্ঘতম অবরোধ
পবিত্র মাসজিদুল আকসার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় রচিত হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি অবরোধের ফলে দীর্ঘ প্রায় দেড় মাস ধরে অবরুদ্ধ হয়ে আছে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। কুদস গবেষকদের মতে, ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবী রহ.-এর মাধ্যমে ক্রুসেডারদের পরাজয়ের পর এই প্রথম এতো দীর্ঘ সময় আকসা ইবাদতকারীদের জন্য বন্ধ রাখা হলো।ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইরানের সাথে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং নিরাপত্তার খাতিরেই মাসজিদুল আকসায় ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। ইসরাইলি পুলিশ মন্ত্রী ইতামার বেন গাভিরের দফতর থেকে জানানো হয়েছে, জননিরাপত্তা রক্ষা এবং যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা রোধে এই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারের উগ্রপন্থী অংশ দাবি করছে যে, এই পবিত্র চত্বরটির ওপর 'পূর্ণ ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব' প্রতিষ্ঠা করা তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার। তাদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সাময়িক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে আজ ৬ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৩৯ দিন মাসজিদুল আকসা কার্যত বন্ধ করে রেখেছে ইসরাইলি দখলদার বাহিনী। এর ফলে পবিত্র রমজান মাসের তারাবিহ, শেষ দশকের ইতিকাফ এবং পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন লাখো ফিলিস্তিনি।কুদস গবেষক ও সিলওয়ান ভূমি রক্ষা কমিটির সদস্য ফাহরি আবু দিয়াব আনাদোলু এজেন্সিকে জানান, "নিরাপত্তার দাবিটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মানুষ বাজারে যেতে পারছে, চলাফেরা করতে পারছে, কেবল আকসায় প্রবেশ করলেই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাত তোলা হচ্ছে।"তিনি আরও জানান, এমনকি আকসার ফটক যেমন 'বাবুল আসবাত' বা 'বাবুস সাহিরা'র বাইরেও নামাজ পড়তে বাধা দেওয়া হচ্ছে।ধর্মীয় নিপীড়ন: কয়েক প্রজন্ম পর এই প্রথম ফিলিস্তিনিরা রমজান ও ঈদ আকসা বিহীন কাটালেন।উচ্ছেদ অভিযান: আকসা বন্ধ রাখার সমান্তরালে পার্শ্ববর্তী সিলওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হচ্ছে। খোদ আবু দিয়াবের বাড়ি ২০২৪ সালে ভেঙে ফেলার পর তিনি বর্তমানে একটি ক্যারাভানে বাস করছেন।জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন: কুদসকে 'ইহুদি শহর' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে স্থানীয় মুসলিম ও খ্রিস্টানদের উচ্ছেদ করে উগ্রবাদী বসতি স্থাপনকারীদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ১৯৯৪ সালের 'স্ট্যাটাস কু' অনুযায়ী, মাসজিদুল আকসার প্রশাসনিক দায়িত্ব জর্ডান নিয়ন্ত্রিত 'ইসলামি ওয়াকফ' কর্তৃপক্ষের। কিন্তু বর্তমানে ইসরাইলি পুলিশ ওয়াকফ প্রশাসনের ক্ষমতা কার্যত কেড়ে নিয়েছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের ১৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে। ইসরাইল 'নিরাপত্তা'র নাম দিয়ে এই মৌলিক অধিকার দীর্ঘমেয়াদে লঙ্ঘন করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়, বরং 'স্থানিক ও সাময়িক বিভাজন' নীতির অংশ, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য আকসার নিচে বা ওপরে কৃত্রিম উপাসনালয় তৈরি করা।ফাহরি আবু দিয়াব আক্ষেপ করে বলেছেন, সম্প্রতি খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের গির্জায় বাধা দেওয়ার পর পশ্চিমা দেশগুলোর (ফ্রান্স, ইতালি) চাপে ইসরাইল পিছু হটলেও, আকসার ক্ষেত্রে ২ বিলিয়ন মুসলিম উম্মাহর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এই নীরবতা দখলদারদের আরও দুঃসাহসী করে তুলছে। পবিত্র স্থাপনা রক্ষার তাগিদে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক তদারকিতে আকসাকে ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করা এবং ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ধ্বংস বন্ধ করা অপরিহার্য।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত