প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তন: পশ্চিমবঙ্গে মানসিক চাপে মুসলিম যুবকের আত্মহত্যা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার জেরে চরম মানসিক হতাশায় এক ৩২ বছর বয়সী মুসলিম যুবক বিষপান করে আত্মহনন করেছেন। ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) প্রক্রিয়ায় নাম কর্তন হওয়ার পর দীর্ঘ আইনি লড়াই ও অনিশ্চয়তার চাপে তিনি এই চরম পথ বেছে নেন বলে পরিবারের দাবি। এই ঘটনা কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও গভীর শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে।ভারতের নির্বাচন কমিশন ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রশাসন বর্তমানে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার জন্য 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সরকারি সূত্রের দাবি, ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা আনতে এবং ভুয়া ভোটার শনাক্ত করতে এই কঠোর প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, যাদের নথিপত্রে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তাদের নাম সাময়িকভাবে ‘বিবেচনাধীন’ (Under Adjudication) রাখা হচ্ছে এবং নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপিল করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তদন্তাধীন এই বিষয়ে বীরভূম জেলা পুলিশ জানিয়েছে, যুবকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি স্থানীয় প্রশাসন।পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার নলহাটি এলাকার বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী আনারুল শেখের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া যায়। দুই সন্তানের জনক আনারুল শেখ একজন সাধারণ নাগরিক ছিলেন, যার নাম সম্পূরক ভোটার তালিকা প্রকাশের পর কর্তন করা হয়েছে বলে জানা যায়।পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যমতে, ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) চলাকালীন আনারুলের নামটিকে ‘বিবেচনাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গত কয়েক দিন ধরে তিনি প্রয়োজনীয় সকল বৈধ নথিপত্র নিয়ে রামপুরহাট মহকুমা শাসকের কার্যালয়ে (SDO Office) ধরনা দিচ্ছিলেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, নথিপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো স্পষ্ট আশ্বাস না পেয়ে তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপে ভেঙে পড়েন।আনারুলের এক আত্মীয় জানান, "অফিসে গিয়েও যখন তিনি কোনো প্রতিকার পাননি, তখন বাড়ি ফিরে তিনি বিষপান করেন।" স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেওয়ার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হচ্ছিল, কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, যথাযথ যাচাই ছাড়াই ঢালাওভাবে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। মৃত যুবকের দুই অবুঝ সন্তান ও পরিবারের সদস্যরা এখন চরম দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।মানবাধিকারকর্মী ও আইনজ্ঞদের মতে, ভোটাধিকার একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। বিশেষত সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সিএএ (CAA) বা এনআরসি (NRC) কেন্দ্রিক পূর্ববর্তী ভীতির প্রেক্ষাপটে ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার এবং স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার রয়েছে। নির্ভরযোগ্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্ট বলছে, প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লে তা কেবল রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং একজন ব্যক্তির মানসিক ভারসাম্যের ওপরও আঘাত হানে। বীরভূমের এই ঘটনাটি স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আরও সংবেদনশীল হওয়া এবং কোনো নাগরিক যেন কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে প্রাণ না হারায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত