প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ঘৃণ্য প্রোপাগান্ডা ও উস্কানির নতুন রূপ: গাজিয়াবাদে 'লাভ জিহাদ' থিমযুক্ত বিতর্কিত শোভাযাত্রা
ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে ধর্মীয় শোভাযাত্রার নামে প্রকাশ্য দিবালোকে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে উস্কানিমূলক এবং ভয়াবহ চিত্রায়নের ঘটনা ঘটেছে। হিন্দু রক্ষা দল নামক একটি সংগঠনের আয়োজিত এই কর্মসূচিতে 'লাভ জিহাদ' ষড়যন্ত্র তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত বিভীষিকাময় প্রদর্শনী করা হয়। এই ঘটনা স্থানীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।গাজিয়াবাদে অনুষ্ঠিত 'হিন্দু ধর্মোদয় যাত্রা'র আয়োজক সংগঠন হিন্দু রক্ষা দল-এর দাবি, এই শোভাযাত্রাটি মূলত "ধর্ম রক্ষায় সমাজকে ঐক্যবদ্ধ এবং সচেতন" করার লক্ষ্যে করা হয়েছিল। তাদের পক্ষ থেকে প্রদর্শনীগুলোকে সামাজিক সচেতনতার অংশ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। এদিকে গাজিয়াবাদ পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষ অনুমতি নিয়েই এই শোভাযাত্রা বের করেছিল। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, "শর্তাধীন অনুমতির ভিত্তিতেই এই আয়োজন করা হয়।" বর্তমানে অঙ্কুর বিহারের সহকারী পুলিশ কমিশনারকে (ACP) বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।গত ৫ এপ্রিল, রবিবার উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলায় হিন্দু রক্ষা দলের উদ্যোগে এক বিশাল শোভাযাত্রা বের করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, শোভাযাত্রার একটি ট্রলিতে তথাকথিত 'লাভ জিহাদ' ষড়যন্ত্রের উস্কানিমূলক দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়।সেখানে দেখা যায়, টুপী ও নকল দাড়ি পরা এক ব্যক্তি (মুসলিম বেশধারী) একটি টেবিলের ওপর বারবার অস্ত্র দিয়ে আঘাত করছে। তার পাশেই একটি লাঠির মাথায় নারীর কাটা মাথার একটি প্রতীকী অংশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা অত্যন্ত বীভৎস ও উস্কানিমূলক। একই সময়ে মহারাষ্ট্রের পুনে জেলার ধায়ারি গ্রামেও অনুরূপ দৃশ্য দেখা গেছে, যেখানে মুসলিমদের ওপর ভিত্তিহীন অভিযোগের চিত্রায়ন করা হয়েছে।এই প্রদর্শনীগুলোতে বিতর্কিত 'দ্য কেরালা স্টোরি' চলচ্চিত্রের দৃশ্যপট ব্যবহার করে মুসলিম পুরুষদের ভিলেন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই ভয়াবহ এবং প্রকাশ্য চিত্রায়ন কেবল মুসলিমদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেনি, বরং সাধারণ পথচারী ও শিশুদের মনে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিমবিদ্বেষী বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছে। ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করছেন, ধর্মীয় উৎসবের আড়ালে এ ধরনের কর্মসূচি মুসলিমদের জানমালের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।মানবাধিকার সংস্থা এবং আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা ধর্মীয় স্বাধীনতার আড়ালে কোনো বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে দানব হিসেবে উপস্থাপন করা এবং তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে উস্কে দেওয়া পরিষ্কারভাবে ভারতীয় দণ্ডবিধি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা থাকলেও তা জনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার শর্তে সীমাবদ্ধ।সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নির্দেশনায় 'হেট স্পিচ' বা ঘৃণ্য বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও প্রশাসনের "শর্তসাপেক্ষ অনুমতি"র দোহাই দিয়ে এমন বীভৎস প্রদর্শনীর সুযোগ করে দেওয়া দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন তোলে। কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পোশাক বা বেশভূষার মাধ্যমে খুনি হিসেবে উপস্থাপন করা কেবল একটি ধর্মের অবমাননা নয়, বরং এটি দাঙ্গা বা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার শামিল।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদেও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উচিত নিছক তদন্তের আশ্বাস না দিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। ধর্মীয় উৎসবকে যাতে কেউ ঘৃণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত