প্রকাশের তারিখ : ১০ এপ্রিল ২০২৬
কাশ্মীরে আসিয়া আনদ্রাবির তিন যাবজ্জীবন: ভারতে বাকস্বাধীনতা হরণ ও উদ্বেগ
ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের প্রবীণ নারী নেত্রী ও ‘দুখতারান-এ-মিল্লাহ’র প্রতিষ্ঠাতা আসিয়া আনদ্রাবিকে তিনটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দিল্লির একটি বিশেষ আদালত। ৬৪ বছর বয়সী এই মহীয়সী নারীর বিরুদ্ধে আনা মূল সন্ত্রাসবাদী অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও কেবল ‘বিদ্বেষমূলক বক্তব্য’ ও ‘মতাদর্শিক অবস্থানের’ ওপর ভিত্তি করে এই কঠোর সাজা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা একে ভারতের ভিন্নমত দমনের একটি সুদূরপ্রসারী নকশা হিসেবে দেখছেন।ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) এবং সরকারি কৌশুলীদের দাবি, আসিয়া আনদ্রাবি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। বিজেপির স্থানীয় নেতারা বলছেন, ২০০৪ সালেই আসিয়া আনদ্রাবির সংগঠন ‘দুখতারান-এ-মিল্লাহ’কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিজেপি নেতা আল-জাজিরাকে বলেন, “তিনি প্রকাশ্যে কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং শাহাদাতের ধারণা প্রচার করে সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করেছেন। এই দণ্ড অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল।” আদালতের ২৯০ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক চন্দর জিৎ সিং উল্লেখ করেন যে, দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিরা তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি, যা অন্যদের কাছে ভুল বার্তা পাঠাতে পারে।২০১৮ সালে ভারতের বিতর্কিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন ‘ইউএপিএ’ (UAPA) এর অধীনে আসিয়া আনদ্রাবি এবং তার দুই সহযোগী সোফি ফাহমিদা (৩৬) ও নাহিদা নাসরিনকে (৬১) গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গত ২৪ মার্চ দিল্লির বিশেষ এনআইএ আদালত আসিয়াকে তিনটি যাবজ্জীবন এবং তার সহযোগীদের ৩০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে।আসিয়ার স্বামী আশিক হুসাইন ফাক্তু ১৯৯২ সাল থেকে কারাগারে বন্দি। আসিয়ার ছেলে আহমেদ বিন কাসিম এই রায়কে ‘কার্যত মৃত্যুদণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ তার মা ইতোমধ্যেই বয়সের ভারে অসুস্থ এবং জীবনের দীর্ঘ সময় কারান্তরালে কাটিয়েছেন।আদালতের রায়ে স্বীকার করা হয়েছে যে, আসিয়ার ভাষণের কারণে কোনো নির্দিষ্ট সহিংসতার ঘটনা ঘটার প্রমাণ মেলেনি। তাসত্ত্বেও, কাশ্মীর ভারতের অংশ নয়—এমন ধারণা প্রচার করাকে ‘জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত’ করার শামিল বলে রায় দেওয়া হয়েছে।১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘দুখতারান-এ-মিল্লাহ’ কাশ্মীরে মুসলিম নারীদের শিক্ষা, অধিকার এবং ইসলামি মূল্যবোধ প্রসারে কাজ করত। বর্তমানে এই রায় কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে যুক্ত নারীদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।আইনি বিশেষজ্ঞরা এই রায়কে গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাদের মতে, কেবল মতাদর্শ বা বক্তব্যের কারণে কাউকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।কাশ্মীরের একজন আইনি গবেষক জানান, “মতাদর্শ কখনো শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে না, কেবল অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডই বিচার্য। কিন্তু ভারত ২০১৯ সালে ইউএপিএ সংশোধন করে ব্যক্তির চিন্তাধারাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পথ খুলে দিয়েছে।”আন্তর্জাতিক আইন এবং ভারতের নিজস্ব সংবিধানও নাগরিকদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়। কিন্তু কাশ্মীরের ক্ষেত্রে এই আইনগুলোকে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করার ‘Israili Model’ অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন।মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও কাশ্মীর টাইমস এই রায়ের সমালোচনা করে বলেছে, ‘অনুশোচনা না করাকে’ সাজার ভিত্তি বানানো অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে বেশি প্রতিফলিত করে।কাশ্মীরের এই প্রবীণ জননীর সাজা কেবল একজন ব্যক্তির কারাদণ্ড নয়, বরং এটি পুরো উপত্যকার কণ্ঠরোধের একটি মহড়া। উম্মাহর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এভাবে আইনি মারপ্যাঁচে পিষ্ট করা বৈশ্বিক ইনসাফের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ভারতের এই একপাক্ষিক বিচারিক আচরণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং কাশ্মীরের জনগণের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত