প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬
শিলংয়ে ‘অবৈধ নির্মাণ’ অভিযোগে মসজিদ বন্ধ করল উগ্রবাদী ছাত্রসংগঠন
ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে একটি মসজিদে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে উগ্রবাদী ছাত্র সংগঠন খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (কেএসইউ)। গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) শহরের লোয়ার লাম্পারিং এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। মসজিদটি অবৈধভাবে নির্মিত এবং এর ইমাম সেখানে অননুমোদিতভাবে অবস্থান করছেন—এমন অভিযোগ তুলে সংগঠনটি ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়, যা ওই অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।খাসি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (কেএসইউ)-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, শিলংয়ের লোয়ার লাম্পারিং এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা জেলা প্রশাসনের কোনো অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। সংগঠনের লাবান সার্কেলের নেতা শাইনিংস্টার চেইন বলেন, "মুসলিমরা এই জমিতে কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই অবৈধভাবে মসজিদটি নির্মাণ করেছে।"তাদের দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট জমিটি মূলত একটি মুসলিম কবরস্থান তদারকির জন্য চৌকিদারের ঘর হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে সেই ঘরটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। চেইন আরও অভিযোগ করেন, "অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ কাজ চালানো হয়েছে এবং কাঠামোর উদ্দেশ্য পরিবর্তন করা হয়েছে।" কেএসইউ-এর দাবি, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী গ্রাম পরিষদ 'দোরবার শনং' ইতিপূর্বে অভিযোগ পেয়ে মসজিদটি পরিদর্শনের পর তা সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা নিজেরাই মসজিদটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৪ এপ্রিল মঙ্গলবার, যখন কেএসইউ-এর একদল কর্মী লোয়ার লাম্পারিংয়ের মসজিদে চড়াও হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, সংগঠনটির সদস্যরা মসজিদের আবাসিক ইমামের মুখোমুখি হয়ে তাকে অবিলম্বে স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছে। তারা অভিযোগ তোলে যে, ইমাম সেখানে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন এবং অনুমোদনহীনভাবে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।এই ঘটনার ফলে শিলংয়ের সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী ও স্থানীয় মুসলিমদের মতে, এটি দীর্ঘদিনের পুরনো একটি ইবাদতখানা যা স্থানীয়দের প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। হঠাৎ করে উগ্রবাদী সংগঠনের হস্তক্ষেপে ধর্মীয় উপাসনালয় বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় স্থানীয় মুসলিমরা তাদের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় মসজিদটি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনালয়ের সুরক্ষা সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। ভারতের সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনো স্থাপনা নিয়ে আইনি বিতর্ক থাকলেও, কোনো বেসামরিক ছাত্র সংগঠন বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে উপাসনালয়ে তালা দেওয়া বা ইমামকে উচ্ছেদ করার এখতিয়ার রাখে না।মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ঐতিহ্যবাহী গ্রাম পরিষদ বা ছাত্র সংগঠনের উস্কানিতে বিচারবহির্ভূতভাবে ধর্মীয় স্থাপনায় হস্তক্ষেপ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের শামিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেকেরই ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে। লোয়ার লাম্পারিংয়ের এই ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নাগরিক নিরাপত্তার স্বার্থে জেলা প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ভূমি রেকর্ড যাচাই করা এবং উগ্রবাদী শক্তির হাত থেকে ধর্মীয় উপাসনালয়টির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একটি বৈচিত্র্যময় সমাজে যেকোনো বিরোধের সমাধান আইনি প্রক্রিয়ায় হওয়া বাঞ্ছনীয়, পেশীশক্তির মাধ্যমে নয়।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত