প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬
মুসলিম চালক নিয়ে নারী যাত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য: অসহিষ্ণুতার নতুন নজির?
ভারতের জনবহুল শহরগুলোতে অ্যাপ-ভিত্তিক ক্যাব পরিষেবা যখন সাধারণ মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা, তখন এক নারী যাত্রীর ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নতুন করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করেছে। মুসলিম চালকদের এড়িয়ে চলা এবং তাদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করার একটি ভিডিও সম্প্রতি নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এই ঘটনাটি পেশাদারিত্বের জায়গায় ধর্মীয় বিভাজনের এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, জনৈক নারী যাত্রী তার বর্তমান ক্যাব চালকের কাছে মুসলিম চালকদের সম্পর্কে তার ভীতি ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। তার প্রধান দাবিগুলো হলো:তিনি মুসলিম চালকদের দেখলে ভয় পান এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের রাইড বাতিল করে দেন। তার ভাষায়, "মুঝে তো মুসলমানোঁ সে বহুত ডর লাগতা হ্যায়" (আমি মুসলমানদের খুব ভয় পাই)।তিনি অভিযোগ করেন যে, মুসলিম চালকরা অত্যন্ত অভদ্র আচরণ করেন এবং কথা বলতে অনিচ্ছুক যাত্রীদের সাথেও জোরপূর্বক কথা বলার চেষ্টা করেন।নারীটির দাবি অনুযায়ী, চালকরা বারবার পেছনের সিটের দিকে তাকান, যা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। তিনি কিছু নির্দিষ্ট নামের উদাহরণ টেনে বলেন যে, অতীতে তার সাথে এমন কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে বলেই তিনি এখন কেবল অমুসলিম চালকদের রাইড গ্রহণ করেন।চালক নিজেও স্বীকার করেন যে, তিনি অন্য যাত্রীদের কাছ থেকেও এমন কথা শুনেছেন যে তারা মুসলিম নাম দেখলে রাইড বাতিল করে দেন।ঘটনাটি গত ১৬ এপ্রিল, ভারতের হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রিক একটি সংবাদ মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই নারী যাত্রী বর্তমান চালকের সাথে কথা বলার আগে কেবল মুসলিম নাম হওয়ার কারণে দু'টি রাইড বাতিল করেছিলেন।ভারতে গত কয়েক বছর ধরে কর্মক্ষেত্রে মুসলিমদের একঘরে করার একটি নীরব প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে উবার বা ওলার মতো ক্যাব পরিষেবাগুলোতে মুসলিম চালকরা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে প্রায়ই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এই ঘটনার ফলে:হাজার হাজার পরিশ্রমী মুসলিম চালক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।পেশাদারিত্বের চেয়ে ধর্মীয় পরিচয় বড় হয়ে ওঠায় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এক পক্ষ একে 'ব্যক্তিগত পছন্দ' বলে জায়েজ করার চেষ্টা করছে, যা পরোক্ষভাবে ইসলামোফোবিয়া বা মুসলিম-বিদ্বেষকে উসকে দিচ্ছে।ভুক্তভোগী অনেক চালক জানান, তারা বছরের পর বছর সততার সাথে কাজ করলেও কেবল নামের কারণে যাত্রীদের কটু কথা শুনতে হয় বা মাঝপথে রাইড বাতিল হয়ে যায়।কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যক্তিগত আচরণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি পুরো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অপরাধী সাব্যস্ত করা বা ভয়ের কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং এটি মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।ভারতীয় সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কর্মক্ষেত্রে এই ধরনের আচরণ পেশাদারিত্বের নীতিমালা লঙ্ঘন করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, ভারতে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণ সাধারণ মানুষের জীবনজীবিকাকে বাধাগ্রস্ত করছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কেবল অনুমানের ভিত্তিতে কোনো জনগোষ্ঠীকে 'অসভ্য' বা 'ভীতিকর' বলা ঘৃণা ছড়ানোর নামান্তর। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর উচিত তাদের অ্যাপে এমন নিরাপত্তা ফিচার যুক্ত করা যা চালক ও যাত্রী উভয়ের মর্যাদা রক্ষা করে। একইসাথে, মিথ্যা অজুহাতে বা ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে রাইড বাতিলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।একটি সভ্য সমাজে মানুষের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার কাজ ও আচরণের ভিত্তিতে, তার বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত