প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
জায়নিস্ট বর্বরতার জীবন্ত সাক্ষী ফিলিস্তিনি নারী: আমার সন্তানরা এখন একা ঘুমাতে ভয় পায়
সম্প্রতি ইতালীয় সাময়িকী 'এল-এসপ্রেসো'র একটি প্রচ্ছদ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে একজন সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী একজন ফিলিস্তিনি নারীকে উপহাস করছে। প্রচ্ছদের সেই নারী, পেশায় আইনজীবী মিয়াদ আবু আল-রুব, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তাঁর ও তাঁর সন্তানদের ওপর চলা পদ্ধতিগত নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। কেবল একটি ছবি নয়, বরং এটি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা প্রতিদিনের রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সহিংসতার এক খণ্ডচিত্র মাত্র।ইতালীয় ম্যাগাজিন 'এল-এসপ্রেসো' (L’Espresso) যখন "নিপীড়ন" (Abuse) শিরোনামে প্রচ্ছদটি প্রকাশ করে, তখন ইসরায়েলি সরকার ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো তাৎক্ষণিক তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ছবিটি "ভ্রান্ত এবং বাস্তবতাকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হয়েছে।" তাদের মতে, এটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি আন্তর্জাতিক প্রোপাগান্ডা। তবে ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষ এই দাবির জবাবে ঘটনার ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে প্রমাণ করেছে যে, প্রচ্ছদের ছবিটি কোনো সাজানো নাটক নয়, বরং প্রকৃত ঘটনার প্রতিচ্ছবি। সরকারি সূত্রগুলো প্রায়ই বসতি স্থাপনকারীদের এই আচরণকে 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বা 'নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ' হিসেবে আখ্যা দিলেও তথ্যপ্রমাণ বলছে অন্য কথা।ঘটনাটি অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-খলিল (হেব্রন) শহরের নিকটবর্তী একটি জলপাই বাগানের।ফিলিস্তিনি আইনজীবী এবং 'ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কাউন্সিল'-এর সদস্য মিয়াদ আবু আল-রুব তাঁর সন্তানদের নিয়ে জলপাই সংগ্রহ করতে গেলে একদল সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বাধার মুখে পড়েন। মিয়াদ জানান, সামরিক পোশাকে সজ্জিত ওই বসতি স্থাপনকারীরা কেবল তাকে উপহাসই করেনি, বরং তাকে ও তার সন্তানদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়।মিয়াদ আবু আল-রুব বলেন, "১২ জন সশস্ত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী আমাদের গাড়ির ওপর উঠে পড়েছিল। আমার চার সন্তান—যাদের বড়টির বয়স মাত্র ৭ বছর এবং ছোটটির দেড় বছর—সেদিন থেকে আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারে না। তারা এখন একা ঘুমাতেও ভয় পায়।" তিনি আরও জানান, এমনকি গর্ভাবস্থায় থাকাকালীনও তিনি টিয়ার গ্যাস, সরাসরি হুমকি এবং শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন।অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া এই সহিংসতার মাত্রা বর্তমানে চরমে পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনি সরকারি তথ্যমতে, গত দুই বছরে পশ্চিম তীরে ১,১৪৯ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১১,৭৫০ জন এবং প্রায় ২২,০০০ মানুষকে বন্দি করা হয়েছে। ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বসতি স্থাপনকারীদের হাতে মারণাস্ত্র তুলে দেওয়ার পর এই হামলাগুলো আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, পশ্চিম তীরে যা ঘটছে তা কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার একটি 'সিস্টেমেটিক পলিসি' বা পদ্ধতিগত নীতি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দখলকৃত অঞ্চলের জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দখলদার শক্তির, কিন্তু এখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী খোদ আক্রমণকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে।জেনেভা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী বেসামরিক নারী ও শিশুদের ওপর হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। মিয়াদ আবু আল-রুবের মতো অসংখ্য ফিলিস্তিনি আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী এবং অনিরাপদ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে টার্গেট করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, যা ডিজিটাল হ্যারাসমেন্ট ও জীবনের নিরাপত্তার সরাসরি লঙ্ঘন।ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্বের প্রতীক জলপাই গাছ উপড়ে ফেলে সেখানে জায়নিস্টদের নতুন চারা রোপণ করা কেবল ভূমি দখল নয়, বরং একটি জাতির স্মৃতি ও পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা। তবে মিয়াদ আবু আল-রুবের কন্ঠে উম্মাহর অবিচল প্রত্যয় ধ্বনিত হয়: "জলপাই গাছের আয়ু তাদের তথাকথিত রাষ্ট্রের চেয়েও বেশি। আমরা এই ভূমির মালিক, তারা স্রেফ আগন্তুক।" বিশ্ববিবেকের কাছে আজ প্রশ্ন—এই শিশুদের বিনিদ্র রজনী আর কত দীর্ঘ হবে?
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত