প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
উত্তরাখণ্ডে মাদরাসা বোর্ড বিলুপ্তির পর সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার তোড়জোড়: অনিশ্চয়তায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ
ভারতের উত্তরাখণ্ডে পুষ্কর সিং ধামি সরকারের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে রাজ্যের মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মাদরাসা বোর্ড বিলুপ্ত করা এবং নবগঠিত ‘সংখ্যালঘু শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’-এ মুসলিম প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে আনার পর এখন মাদরাসাগুলোকে সরাসরি সাধারণ শিক্ষা বিভাগের অধীনে আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এই পদক্ষেপকে মাদরাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নষ্ট করার কৌশল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।উত্তরাখণ্ড সরকারের পক্ষ থেকে এই সংস্কারকে ‘শিক্ষার আধুনিকায়ন’ এবং মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ‘মূলধারার’ সঙ্গে যুক্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র ও মন্ত্রী খাজান দাসের বক্তব্য অনুযায়ী, “মাদরাসা বোর্ড বিলুপ্ত করে একটি অভিন্ন সিলেবাস প্রবর্তন করাই মূল লক্ষ্য, যাতে শিক্ষার্থীরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পায়।”মন্ত্রী খাজান দাস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, সরকারের লক্ষ্য ধর্মীয় শিক্ষায় হস্তক্ষেপ করা নয় বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করা। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, অনেক মাদরাসা যথাযথ নিয়ম মানছে না, তাই কঠোর নজরদারির প্রয়োজন। যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়ম বা শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনা মানবে না, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভাষ্যে এটি একটি ‘উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ’ যা মুসলিম তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।গত ২০ এপ্রিল ২০২৬-এ মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামি মাদরাসা বোর্ড বিলুপ্ত করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন, যা আগামী জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে। রাজ্যের প্রায় ৪৫২টি নিবন্ধিত মাদরাসা এই সিদ্ধান্তের ফলে সরাসরি প্রভাবিত হবে।প্রতিনিধিত্বের সংকট: মাদরাসা বোর্ডের বিকল্প হিসেবে গঠিত ১২ সদস্যের ‘সংখ্যালঘু শিক্ষা কর্তৃপক্ষ’-এ মাত্র ২ জন মুসলিম সদস্য রাখা হয়েছে। জনতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বিবেচনায় এই নগণ্য প্রতিনিধিত্বকে বৈষম্যমূলক হিসেবে দেখছেন উলামায়ে কেরাম।জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মাদরাসাগুলোকে এখন সাধারণ শিক্ষা বিভাগ এবং নতুন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে দ্বৈত অনুমোদন নিতে হবে। ইসলামী শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ শাহনজরের মতে, “স্কুল ও মাদরাসার সময়সূচি এবং নিয়মকানুন সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুই ধরনের কঠোর নিয়মের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখা মাদরাসাগুলোর জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।”পরিচালকদের উদ্বেগ: গত বুধবার (২২ এপ্রিল) হরিদ্বারে মাদরাসা পরিচালক ও ইসলামিক সংগঠনগুলোর এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিএসপি বিধায়ক মোহাম্মদ শাহজাদের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের শঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রধান উদ্বেগ হলো, আধুনিক শিক্ষার নামে মাদরাসার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা পরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলা হতে পারে।ভারতের সংবিধানের ৩০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। উত্তরাখণ্ড সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো এই সাংবিধানিক সুরক্ষাকে ক্ষুণ্ণ করছে কি না, সেই প্রশ্নটি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের—বিশেষ করে যাদের ধর্মীয় আবেগ ও অধিকার এর সাথে যুক্ত—যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। ১২ সদস্যের কমিটিতে মাত্র ২ জন মুসলিম প্রতিনিধি রাখার বিষয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে একপাক্ষিক আধিপত্যের ইঙ্গিত দেয়। এছাড়া, বিগত বছরগুলোতে রাজ্যে বুলডোজার অভিযানের মাধ্যমে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ এবং মাদরাসা সিল করে দেওয়ার ঘটনাগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো নীতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ জরুরি। মাদরাসা শিক্ষা সংস্কারের নামে যদি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা হয়, তবে তা কেবল আইনি জটিলতাই বাড়াবে না, বরং সামাজিক সংহতিকেও বাধাগ্রস্ত করবে। সরকারের উচিত উলামায়ে কেরাম ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এমন এক সমাধান বের করা, যা ধর্মীয় শিক্ষার মান রক্ষা করে আধুনিকায়নের পথ সুগম করবে।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত