প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
দিল্লীতে থানায় মুসলিম যুবককে হত্যার অভিযোগ: পুলিশের দাবি পানিশূন্যতায় মৃত্যু
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীর জাহাঙ্গীরপুরী এলাকায় পুলিশ হেফাজতে আনিস (৩৪) নামে এক মুসলিম যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। নিহতের পরিবারের দাবি, আনিসকে কোনো কারণ ছাড়াই তুলে নিয়ে থানায় নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, দিল্লী পুলিশ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে যে, শারীরিক অসুস্থতা ও পানিশূন্যতার (ডিহাইড্রেশন) কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।দিল্লী পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, রুটিন টহল চলাকালীন ভোর রাত ৩টা ৩০ মিনিটের দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনিসকে থানায় আনা হয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, থানায় আনার পর আনিস হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন এবং তাকে পানি পান করানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত বাবু জগজীবন রাম মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিক মেডিকেল রিপোর্টের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, তার শরীরে কোনো বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন নেই এবং অতিরিক্ত গরম বা পানিশূন্যতা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ।ভয়াবহ এই ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর-পশ্চিম দিল্লীর জাহাঙ্গীরপুরী থানায়। নিহত আনিস ভালসওয়া ডেইরি এলাকার বাসিন্দা এবং আজাদপুর সবজি মান্ডির একজন শ্রমিক ছিলেন। তিনি তার স্ত্রী ও তিনটি নাবালিকা কন্যা সন্তানের (বয়স যথাক্রমে ৯, ৬ ও ২ বছর) একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবক ছিলেন।পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১টার দিকে সবজি কেনার টাকা নিয়ে আনিস মান্ডির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। পথে পুলিশ তাকে ও তার এক বন্ধুকে আটক করে। আনিসের মা কান্নায় ভেঙে পড়ে গণমাধ্যমকে বলেন, "আমার ছেলে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় একদম সুস্থ ছিল। পুলিশ তাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে নির্মমভাবে পিটিয়েছে। সকাল ১০টা পর্যন্ত তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং এরপর সে মারা গেছে, সেই বন্ধু মারধরের বিষয়টি পরিবারকে জানিয়েছিল।"ঘটনার সময় আনিসের সাথে থাকা তার বন্ধু বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। দিনভর জাহাঙ্গীরপুরী থানার সামনে বিক্ষোভ করেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, পুলিশ সত্য আড়াল করার চেষ্টা করছে এবং একজন নিরীহ মুসলিম শ্রমিককে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।ভারতে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু বা 'কাস্টোডিয়াল ডেথ' একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার সংকট হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC) এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতে যে কোনো মৃত্যুর ক্ষেত্রে বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে তদন্ত হওয়া বাধ্যতামূলক।মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলছেন, যদি কোনো অপরাধের সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তবে গভীর রাতে একজন শ্রমিককে কেন থানায় নিয়ে যাওয়া হলো? এছাড়া, আনিসের বন্ধুর নিখোঁজ থাকা বিষয়টি নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী, কাউকে নির্যাতন বা নিষ্ঠুর আচরণের শিকার করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং আইন-শৃঙ্খলার ওপর জনগণের আস্থা টিকিয়ে রাখতে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য।সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত জীবনের অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও পুলিশ প্রশাসনকে দায়বদ্ধ হতে হবে। আনিসের অসহায় তিনটি কন্যার ভবিষ্যৎ এবং বিধবা স্ত্রীর ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এখন ভারতের বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত