প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
ফ্রান্সে ফের হিজাব বিতর্ক: মুসলিম কর্মীদের গণছাঁটাইয়ের অভিযোগ ফরাসি কোম্পানির বিরুদ্ধে
ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাক হিজাব বা মাথা ঢেকে রাখার ওপর রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ফ্রান্সভিত্তিক বিশ্বখ্যাত খাবার ও পরিচ্ছন্নতা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘এলিওর-ডেরিশবার্গ’-এর বিরুদ্ধে তাদের হিজাবধারী নারী কর্মীদের অন্যায়ভাবে ছাঁটাই ও লাঞ্ছনার অভিযোগ উঠেছে। ফরাসি গণমাধ্যম মিডিয়াপার্ট-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।ফরাসি বহুজাতিক কোম্পানি ‘এলিওর-ডেরিশবার্গ’ তাদের এই কঠোর পদক্ষেপকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ‘নিরপেক্ষতা নীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, কর্মক্ষেত্রে কোনো প্রকার ধর্মীয় বা রাজনৈতিক প্রতীক প্রদর্শন করা প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্বের পরিপন্থী। তারা বিষয়টিকে ঢালাও ধর্মীয় নিপীড়ন হিসেবে মানতে নারাজ। কোম্পানিটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এটি কোনো বিশেষ ধর্মকে টার্গেট করার বিষয় নয়, বরং এটি কেবল ‘কয়েকটি ব্যক্তিগত শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়া’। মূলত ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা বা ‘লাইসিতে’-এর দোহাই দিয়ে কোম্পানিটি তাদের এই অবস্থানকে আইনসম্মত প্রমাণের চেষ্টা করছে।ফরাসি সংবাদমাধ্যম মিডিয়াপার্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত প্যারিস ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কোম্পানি শাখাগুলাতে। দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করা বেশ কয়েকজন মুসলিম নারী কর্মীকে হঠাৎ করেই তাদের হিজাব খুলে ফেলার নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ। অনেক কর্মী যারা নিয়োগের সময় থেকেই হিজাব পরতেন, তাদের ওপরও এই চাপ সৃষ্টি করা হয়।প্রতিবেদনে জানা গেছে, যারা ধর্মীয় বিশ্বাস বজায় রেখে হিজাব খুলতে অস্বীকার করেছেন, তাদের ‘গুরুতর অপরাধ’-এর অজুহাতে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যান্য হিজাবধারী কর্মীদেরও একই পরিণতি ভোগ করার জন্য সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা বছরের পর বছর নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসলেও হঠাৎ করে তাদের ধর্মীয় সত্তাকে কর্মক্ষেত্রে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়েছে। অনেক কর্মীর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন শৃঙ্খলা ভঙ্গের অজুহাতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা হয়েছে, যা মূলত তাদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগে বাধ্য করার একটি কৌশল বলে মনে করা হচ্ছে।মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে সরাসরি ধর্মীয় বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের (ECHR) বিভিন্ন রায়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলা হলেও ফ্রান্সে ‘নিরপেক্ষতা’র নামে মুসলিমদের নাগরিক অধিকার বারবার সংকুচিত করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো কর্মীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করা আইনত দণ্ডনীয়।বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সে মুসলিমবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে। সংবিধান নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার গ্যারান্টি দিলেও ব্যক্তিগত খাতের কোম্পানিগুলো হিজাবকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। কেবল ‘অভ্যন্তরীণ নীতি’র দোহাই দিয়ে নারী কর্মীদের রুটি-রুজি কেড়ে নেওয়া এবং তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধকে অবমাননা করা কোনো সভ্য সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। এই সংকট নিরসনে ফরাসি সরকারকে তার নাগরিক সুরক্ষা ও সাম্যের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত