প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
উত্তরপ্রদেশের খলিলাবাদে মাদ্রাসা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন: অবৈধ নির্মাণ ও বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ তুলে
ভারতের উত্তরপ্রদেশের সন্ত কবির নগর জেলার খলিলাবাদে একটি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমি ও নির্মাণ সংক্রান্ত ত্রুটির পাশাপাশি বিদেশি অর্থায়নের গুরুতর অভিযোগ তোলা হলেও এই পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়।খলিলাবাদ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদরাসাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পেছনে প্রধানত ‘অবৈধ নির্মাণ’ ও ‘ভূমির স্বত্ব’ সংক্রান্ত ত্রুটিকে সামনে আনা হয়েছে। সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট (SDM) হৃদয় রাম তিওয়ারি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "বর্তমানে এই সংক্রান্ত কোনো মামলা আদালতে বিচারাধীন নেই। মাদরাসা কমিটির পক্ষ থেকে দায়ের করা আপিলটি গত কালই (২৫ এপ্রিল) খারিজ হয়ে যাওয়ার পর আমরা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছি।"প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, মাদরাসাটি কোনো পূর্বানুমোদন বা সরকারি অনুমোদিত নকশা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছিল। অধিকন্তু, জমিটি সম্প্রতি সরকারি সম্পত্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সেখানে কোনো বেসরকারি স্থাপনা থাকা বেআইনি বলে তারা উল্লেখ করেন। এছাড়া, এই মাদরাসার সাথে ব্রিটেন প্রবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাওলানা শামসুল হুদা খানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ দাবি করেছে যে, রাজা ফাউন্ডেশন নামক একটি এনজিওর মাধ্যমে সন্দেহজনক বিদেশি অর্থায়ন এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। মাওলানা খানের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে একাধিক এফআইআর দায়ের করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।গত ২৬ এপ্রিল খলিলাবাদের ‘মিট মান্ডি’ এলাকায় অবস্থিত ওই মাদরাসাটি ভারী পুলিশ বেষ্টনী এবং বুলডোজারের সহায়তায় গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়। এ সময় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জয় প্রকাশ এবং সার্কেল অফিসার প্রিয়ম রাজশেখরসহ বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী উপস্থিত ছিলেন।মাদরাসাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ফলে শত শত শিক্ষার্থী তাৎক্ষণিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, এই প্রতিষ্ঠানটি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার একমাত্র নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র ছিল।প্রশাসনের এমন হঠাৎ কঠোর পদক্ষেপে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়েছে।মাওলানা শামসুল হুদা খানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করে তার পাকিস্তান সফরের ইতিহাস সামনে আনা হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট মাদরাসা কমিটি বা মাওলানা খানের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক বলে অভিহিত করা হয়েছে।মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যেকোনো স্থাপনা উচ্ছেদের আগে যথেষ্ট সময় প্রদান এবং যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ভারতের সংবিধানের ২৮ ও ৩০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার অধিকার রয়েছে।প্রশাসন মাদরাসাটি ভাঙার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি করলেও, আইনি আপিল খারিজের পরদিনই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার পেছনে ‘প্রশাসনিক অতি-তৎপরতা’ লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, শিক্ষার অধিকার একটি মৌলিক অধিকার। যেকোনো বিতর্কিত অর্থায়ন বা আইনি ত্রুটির জন্য তদন্ত চলমান থাকতে পারে, কিন্তু সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।আইনি কাঠামো অনুযায়ী, অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই কোনো ব্যক্তির প্রতিষ্ঠিত স্থাপনা ভেঙে ফেলা ‘প্রি-অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচার-পূর্ব দণ্ড প্রদানের শামিল কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠছে। এই পরিস্থিতিতে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সুরক্ষা বজায় রাখা সুশাসনের দাবি। দায়বদ্ধতার প্রশ্নে প্রশাসনকে প্রমাণ করতে হবে যে, এই অভিযান কেবল আইনি প্রয়োজন ছিল, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা নয়।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত