প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম নিপীড়ন: ৫তম আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্কৃতি সম্মেলনে উদ্বেগের সুর
তুরস্কের কোজাইলি শহরে অনুষ্ঠিত ‘৫ম আন্তর্জাতিক ইসলামি সংস্কৃতি ও সভ্যতা সিম্পোজিয়াম’-এ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংখ্যালঘু অঞ্চলগুলোর সংকট নিরসনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্মেলনে ফিলিপাইনের মোরো, থাইল্যান্ডের পাতানি, মিয়ানমারের আরাকান এবং ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের মুসলিম প্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে অঞ্চলগুলোতে চলমান পদ্ধতিগত নিপীড়ন, পরিচয় সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের বাস্তব চিত্র।তুরস্কের হিউম্যানিটেরিয়ান রিলিফ ফাউন্ডেশন (IHH)-এর আয়োজনে কোজাইলি কংগ্রেস সেন্টারে আয়োজিত এই সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার নির্যাতিত মুসলিম জাতিসত্তার প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। আলোচনায় প্রাধান্য পায় ধর্মীয় পরিচয় রক্ষা এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম।মোরো মুসলিমদের সফল সংগ্রামসিম্পোজিয়ামে ফিলিপাইনের বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের প্রতিনিধি ওমর কেসমেন বলেন, মোরো মুসলিমরা দীর্ঘ ৬০ বছরের লড়াই শেষে ম্যানিলা সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তিনি জানান, বর্তমানে স্বায়ত্তশাসিত সরকার খ্রিস্টান ও মুসলিমদের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে সেবা প্রদান করছে। কেসমেন জোর দিয়ে বলেন, মোরোদের এই ‘নৈতিক সংগ্রাম’ বিশ্বজুড়ে শোষিত মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা। একসময় মোরোরা তাদের পরিচয় হারাতে বসেছিল, কিন্তু সংগ্রামের মাধ্যমেই তারা নিজেদের অস্তিত্ব ফিরে পেয়েছে।কাশ্মীরে ‘হিন্দুত্ববাদ’ ও নাৎসিবাদের তুলনাওয়ার্ল্ড কাশ্মীর ফ্রিডম মুভমেন্টের প্রতিনিধি ড. মোজাম্মেল আইয়ুব ঠাকুর কাশ্মীরের ২০০ বছরের সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার ‘হিন্দুত্ববাদ’ মতাদর্শ চাপিয়ে দিয়ে মুসলিম পরিচয় মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তিনি হিন্দুত্ববাদকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসিবাদের সাথে তুলনা করে বলেন, "নাৎসিবাদ, জায়নাবাদ এবং হিন্দুত্ববাদ—এই তিন মতাদর্শই শ্রেষ্ঠত্ববাদী এবং একে অপরের সাথে সংযুক্ত।" তিনি এই মতাদর্শকে এই অঞ্চলের জন্য একটি ‘ক্যানসার’ হিসেবে অভিহিত করেন।আরাকান: ‘ইসলামশূন্য’ করার নীল নকশাআরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের (ARNC) প্রতিনিধি আনোয়ার আরাকানি মিয়ানমার জান্তার নৃশংসতার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, মিয়ানমার বর্তমানে একটি ‘শরণার্থী তৈরির কারখানায়’ পরিণত হয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগে শুরু হওয়া জাতিগত নিধনে প্রাণ হারানো মানুষের সঠিক পরিসংখ্যান আজও অজানা। আনোয়ার জানান, রোহিঙ্গা মুসলিমদের সামনে দুটি পথ রাখা হয়েছে—হয় বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করা, না হয় অস্ত্রের মুখে দেশত্যাগ। তিনি দাবি করেন, এই সংকটের মূলে রয়েছে মিয়ানমারকে ‘ইসলামশূন্য’ করার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।পাতানি মুসলিমদের পরিচয় সংকটথাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের মালে পাতানি মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী কস্তুরী মাহকোটা বলেন, পাতানি মুসলিমরা কাঠামোগত বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বহীনতার শিকার। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানান যে, সেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চরম অসমতা বিরাজ করছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মালে পাতানি পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।সিম্পোজিয়ামটি এই বার্তাই প্রদান করেছে যে, দক্ষিণ এশীয় মুসলিম দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত