প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬
আড়াই বছর ধরে চলা মসজিদের নির্মাণকাজ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের আপত্তিতে বন্ধ করল প্রশাসন
ভারতের উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলায় একটি নির্মাণাধীন মসজিদের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় মসজিদটির নির্মাণ কাজ চললেও সম্প্রতি কয়েকটি হিন্দু সংগঠনের আপত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে আমোনি গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলার রুদ্রপুর থানার অন্তর্গত আমোনি গ্রামে দীর্ঘ ৩০ মাস ধরে কোনো বিবাদ ছাড়াই একটি মসজিদের নির্মাণ কাজ চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গ্রামবাসীর নিজস্ব অনুদান এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এটি গড়ে উঠছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে কতিপয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠন মসজিদটির নির্মাণ নিয়ে আপত্তি তুলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানায়। তাদের দাবি, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়াই এই ধর্মীয় স্থাপনাটি তৈরি করা হচ্ছে।আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত আড়াই বছর ধরে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মাণ কাজ চললেও প্রশাসন তখন কোনো বাধা দেয়নি। মসজিদের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ যখন প্রায় শেষের দিকে, তখনই রুদ্রপুরের মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট (SDM) এবং পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। এমনকি সাইট থেকে বিমসহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী সরিয়ে ফেলা হয়েছে।গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত জানান, "আমরা গ্রামবাসীদের সহায়তায় এই মসজিদটি নির্মাণ করছিলাম। আমরা প্রথাগত অনুমতি নিইনি ঠিকই, তবে এখন আমরা আবেদন করব এবং অনুমোদন পেলে পুনরায় কাজ শুরু করব।" স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাসিন্দারাও জানান, গ্রামে আগে কখনো এই মসজিদ নিয়ে কোনো উত্তেজনা ছিল না। বাইরের সংগঠনের হস্তক্ষেপেই গ্রাম্য সম্প্রীতির পরিবেশ আজ বিঘ্নিত।গ্রামবাসীদের প্রশ্ন—যদি আইনি জটিলতা থেকে থাকে, তবে দীর্ঘ আড়াই বছর কেন প্রশাসন নীরব ছিল? কেন কাঠামোটি প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পর তা বন্ধ করা হলো? অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের মুখে প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এই ঘটনা উত্তরপ্রদেশে ধর্মীয় স্থাপনা এবং সংখ্যালঘু স্বার্থ রক্ষায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন তুলেছে।বর্তমানে আমোনি গ্রামে এক ধরণের অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুতই মসজিদটির কাজ শুরু হবে এবং গ্রামের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক ঐক্য অটুট থাকবে। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।উত্তরপ্রদেশে বর্তমানে বিজেপি শাসনামলে ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিবাদ ক্রমশ বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত চাপে পড়ে প্রশাসন পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে। আমোনি গ্রামের ক্ষেত্রেও স্থানীয় সম্প্রীতি বজায় থাকলেও বাইরের সংগঠনের হস্তক্ষেপ উত্তেজনা তৈরি করেছে। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দিলেও, জমি এবং স্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল আইনের প্রাসঙ্গিকতা এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।বিগত কয়েক বছরে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় পুরনো মসজিদ বা নতুন মসজিদ নির্মাণ নিয়ে আইনি লড়াই ও প্রশাসনিক বুলডোজার অভিযানের হার বেড়েছে। এর আগে সম্বল এবং বারাবাঁকিতেও একই ধরনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়েছিল।আমোনি গ্রামের ঘটনাটি কেবল একটি নির্মাণকাজ বন্ধের বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের প্রতিফলন। ঘটনার শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই এখন গ্রামবাসীদের একমাত্র চাওয়া।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ