প্রকাশের তারিখ : ১৬ মে ২০২৬
উইঘুর জন্মহার ৬০% কমেছে দাবিটি নতুন নয়, পুরোনো রিপোর্টের পুনঃপ্রচার
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিমদের জন্মহার তিন বছরে ৬০ শতাংশ কমে যাওয়া এবং চীনের জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ নীতি নিয়ে নতুন করে তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভাইরাল হওয়া এই দাবিগুলো নতুন কোনো ঘটনার অংশ নয়; বরং এগুলো ২০২০ ও ২০২১ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন পশ্চিমা গবেষণা ও মানবাধিকার প্রতিবেদনের পুরোনো তথ্যের পুনঃপ্রচার।সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, চীনের পদ্ধতিগত দমনপীড়নের কারণে তিন বছরে উইঘুর মুসলিমদের জন্মহার ৬০% হ্রাস পেয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া একটি বিশেষ 'ক্যাম্পেইনের' আওতায় প্রায় ৮০% উইঘুর নারীকে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ, জন্মনিরোধক বড়ি ব্যবহারে বাধ্য করা এবং ইন্ট্রায়ুটেরিন ডিভাইস (IUD) স্থাপনে বাধ্য করার অভিযোগ আনা হয়েছে এসব পোস্টে। পোস্টগুলোতে এটিকে চীনের "উইঘুর জনগোষ্ঠী বিলুপ্ত করার চলমান প্রক্রিয়া" হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভাইরাল হওয়া এই পরিসংখ্যানগুলোর মূল উৎস জার্মান গবেষক ড. অ্যাড্রিয়ান জেঞ্জ-এর ২০২০ ও ২০২১ সালের একটি গবেষণা প্রতিবেদন। তৎকালীন সময়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) এই গবেষণাটি প্রকাশ করে।ড. জেঞ্জের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর অধ্যুষিত হোতান ও কাশগড় অঞ্চলে জন্মহার প্রায় ৪৮.৭% কমেছে।ভাইরাল পোস্টে "৮০% উইঘুর নারী বন্ধ্যাকরণের শিকার" দাবি করা হলেও, মূল গবেষণায় বলা হয়েছিল—জিনজিয়াংয়ের নির্দিষ্ট কিছু কাউন্টিতে কেবল সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত বয়সের নারীদের একাংশকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছিল, সামগ্রিক উইঘুর নারী জনসংখ্যার ৮০% নয়।২০২১ সালে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস এক টুইট বার্তায় দাবি করেছিল, চরমপন্থা দূরীকরণের ফলে উইঘুর নারীরা মানসিক মুক্তি পেয়েছেন এবং তারা আর "সন্তান উৎপাদনের মেশিন" (Baby-making machines) নন। ওই টুইটটি তীব্র বৈশ্বিক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং পরবর্তীতে টুইটার (বর্তমানে এক্স) সেটি নীতিমালার লঙ্ঘনের দায়ে অপসারণ করে।চীন সরকার বরাবরই "জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ" বা "গণহারে উইঘুর জনসংখ্যা হ্রাসের" এই অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে জিনজিয়াংয়ে উইঘুর জনসংখ্যা ১০.১৭ মিলিয়ন থেকে বেড়ে ১২.৭১ মিলিয়নে (প্রায় ২৫% বৃদ্ধি) উন্নীত হয়েছিল, যা একই সময়ে সেখানকার হান চীনাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি।চীন সরকার যুক্তি দেয় যে, দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে চলা "এক সন্তান নীতি" শিথিল করার পর বর্তমানে জাতীয়ভাবে সব জাতিগোষ্ঠীর জন্যই সমান পরিবার পরিকল্পনা নীতি প্রযোজ্য।২০২৫ ও ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও জনমিতিক বিশ্লেষণগুলো দেখাচ্ছে যে, কেবল জিনজিয়াং নয়, বরং অর্থনৈতিক মন্দা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পুরো চীনের সামগ্রিক জন্মহারই এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।উইঘুর নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া সংক্রান্ত মানবাধিকার উদ্বেগগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বহাল থাকলেও, বর্তমানে ২০২৬ সালে নতুন করে "৬০% জন্মহার হ্রাস" বা নতুন কোনো বন্ধ্যাকরণ অভিযানের কোনো সত্যতা বা নতুন আন্তর্জাতিক রিপোর্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে পুরোনো ডেটা নতুন দাবিতে শেয়ার হচ্ছে।উইঘুর ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের হলেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে পুরোনো পরিসংখ্যানকে বর্তমানের নতুন ঘটনা হিসেবে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর। যেকোনো সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পুরোনো প্রেক্ষাপট ও বর্তমানের প্রকৃত ডেটার পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ