প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬
মুম্বাইয়ে উচ্ছেদের নামে প্রাচীন মসজিদ ধ্বংস: পুলিশি লাঠিচার্জ ও আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
ভারতের অর্থনৈতিক রাজধানী মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় রেলওয়ের জমি থেকে উচ্ছেদ অভিযানের নামে বহু বছরের পুরোনো একটি মসজিদ ও ৫০০-রও বেশি গরিব মানুষের ঝুপড়ি ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ এবং পাথর ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।ভারতের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে সংখ্যালঘু এলাকা, তাদের ধর্মীয় উপাসনালয় এবং মাদ্রাসার ওপর বুলডোজার চালানো বা উচ্ছেদ অভিযান যেন থামছেই না। এরই ধারাবাহিকতায় এবার মুম্বাইয়ের বান্দ্রা রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এক ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা।গত বৃহস্পতিবার (২১ মে, ২০২৬) সকাল থেকে প্রশাসন অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নাম করে বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু অভিযানের এক পর্যায়ে বহু বছরের পুরোনো একটি মসজিদ ভেঙে ফেলার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত গরিব মানুষের বাসস্থান এবং ধর্মীয় উপাসনালয়। অন্যদিকে প্রশাসন এটিকে আদালতের আদেশের যথাযথ প্রতিফলন বলে দাবি করছে।প্রতিবাদ, সংঘর্ষ ও লাঠিচার্জপশ্চিম রেলওয়ের এই উচ্ছেদ অভিযান চলাকালীন যখন মসজিদটি ভাঙা শুরু হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যসহ বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ জড়ো হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে, যার ফলে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। পুলিশের দাবি, উচ্ছেদ অভিযান প্রতিহত করতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ সেখানে জড়ো হয়ে নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করেছিল। এই ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।আতঙ্ক ও তল্লাশি অভিযানসংঘর্ষের পর বান্দ্রা এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে পুরো এলাকায় ১ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উচ্ছেদ অভিযানের পর পুলিশ এখন আশেপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। ঘর-বাড়ি থেকে সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উচ্ছেদ ও প্রতিবাদে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে প্রশাসন ফেসিয়াল রিকগনিশন (মুখাবয়ব চেনার প্রযুক্তি) এবং স্থানীয় গোয়েন্দা তথ্যের সাহায্য নিচ্ছে।রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্যরেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, বোম্বে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পশ্চিম রেলওয়ে জানিয়েছে, বান্দ্রা স্টেশনের কাছে প্রায় ৫০০টি ঝুপড়ি ঘর অপসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ১৮ শতাংশ অংশ খালি করা হয়েছে।পাঁচ দিনব্যাপী চলমান এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো রেলওয়ের প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বর্গমিটার জমিকে দখলমুক্ত করা। উদ্ধারকৃত এই জমি বান্দ্রা টার্মিনাসের সম্প্রসারণ, বহুতল ভবন নির্মাণ, অতিরিক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধার কাজে ব্যবহার করা হবে। পশ্চিম রেলওয়ের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা বিনীত অভিষেক সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে জানিয়েছেন, এই উচ্ছেদ অভিযান আগামী ২৩ মে, ২০২৬ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।ভারতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকারি জমি উদ্ধার ও তথাকথিত 'অবৈধ স্থাপনা' উচ্ছেদের নামে সংখ্যালঘু ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে বুলডোজার চালানো বা বুলডোজার অ্যাকশন একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটি একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে নিশানা করার হাতিয়ার, যদিও প্রশাসন সর্বদা একে সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের আইনগত আদেশের বাস্তবায়ন বলে উল্লেখ করে আসছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ