প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
মুসলিমদের ‘সবুজ সাপ’ ও ‘জিহাদি’ আখ্যা বিজেপি নেতার: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান
ভারতের মহারাষ্ট্রের মৎস্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নীতেশ রানে মুসলিম সম্প্রদায়কে ‘সবুজ সাপ’ ও ‘জিহাদি’ বলে আখ্যায়িত করে চরম উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। মুম্বাইয়ে আয়োজিত এক প্রকাশ্য জনসভায় তিনি দেশের প্রচলিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বধর্ম সমভাবের ধারণাকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর এই তীব্র বিদ্বেষমূলক ও ঘৃণাবাচক বক্তব্য ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় তুলেছে।ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারো ধর্মীয় মেরুকরণের তীব্র সুর ধ্বনিত হলো মহারাষ্ট্রের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর কণ্ঠে। গত ১৪ মে মুম্বাইয়ের আন্ধেরি ইস্ট এলাকায় 'সকাল হিন্দু সমাজ' কর্তৃক আয়োজিত এক সম্ভাজি জয়ন্তী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছিলেন রাজ্য সরকারের মৎস্যমন্ত্রী নীতেশ রানে। গেরুয়া পোশাক ও মাথায় বিশেষ টুপি পরিহিত এই হিন্দুত্ববাদী নেতা মঞ্চ থেকে মুসলিমদের লক্ষ্য করে একের পর এক আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন।সম্প্রীতি প্রত্যাখ্যান ও দেশত্যাগের হুমকিচরমপন্থী স্লোগান ও জয় শ্রী রাম ধ্বনির মধ্যে নীতেশ রানে তাঁর ভাষণে বলেন, "হিন্দুদের স্বার্থই সবার আগে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো ‘ভাইচারা’ (ভ্রাতৃত্ববোধ) কিংবা ‘সর্বধর্ম সমভাব’ (সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা) বলতে কিছু নেই। যারা এই শব্দগুলোতে বিশ্বাস করে, তাদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত। এখানে তাদের থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।"তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে ইঙ্গিত করে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, "এই সবুজ সাপগুলো আমাদের হিন্দুদের চারপাশে ঘোরাফেরা করতেই থাকবে, কিন্তু আমাদের ভয় পেলে চলবে না।"'আই লাভ মুহাম্মদ' বিতর্কের সূত্রপাতসমাবেশে নীতেশ রানে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, "এটি মহাদেবের ভূমি। এখানে কেবল ‘আই লাভ মহাদেব’ চলবে, কোনো ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ চলবে না।" তাঁর এই মন্তব্য মূলত গত বছর ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী পরিচালিত একটি অহিংস প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এসেছে।উল্লেখ্য, উত্তর প্রদেশের কানপুরে ঈদে মিলাদুন্নবী (মহানবী সা.-এর জন্মবার্ষিকী) উদযাপনকালে মুসলিম যুবকেরা ‘আই লাভ মুহাম্মদ’ লেখা ব্যানার প্রদর্শন করলে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী এবং স্থানীয় পুলিশ তাতে তীব্র আপত্তি জানায়। প্রশাসন এটিকে একটি "নতুন প্রথা" হিসেবে আখ্যা দিয়ে বাধা সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের শেষের দিকে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ বিভিন্ন রাজ্যে বেআইনি সমাবেশের অভিযোগে ৪,৫০০-এরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং শত শত মুসলিমকে গ্রেপ্তার করে।জনসভায় নিজের মন্ত্রীত্বের ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে নীতেশ রানে উপস্থিত হিন্দু জনতাকে আশ্বস্ত করে বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে এবং এসব নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন সাংবিধানিক পদে থাকা মন্ত্রীর এমন উসকানিমূলক বক্তব্য দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য বড় হুমকি।ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী ধর্মীয় বৈষম্যহীনতার অধিকার সুরক্ষিত। একজন দায়িত্বরত রাজ্য মন্ত্রী কর্তৃক জনসমক্ষে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে এ ধরনের অবমাননাকর মন্তব্য করা এবং সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করা আইনি কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার নীতিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।নীতীশ রাণে মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নারায়ণ রাণের পুত্র এবং তিনি প্রায়শই তাঁর কট্টর হিন্দুত্ববাদী অবস্থান ও বিতর্কিত রাজনৈতিক মন্তব্যের জন্য সংবাদ শিরোনামে আসেন। ভারতের রাজনীতিতে নির্বাচন বা উৎসবকে কেন্দ্র করে এ ধরনের মেরুকরণ সৃষ্টিকারী বক্তব্য দেওয়ার প্রবণতা নতুন নয়।গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী একটি রাষ্ট্রে একজন দায়িত্বশীল সরকারি প্রতিনিধির কাছ থেকে সব নাগরিকের সমঅধিকার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রত্যাশা করা হয়। এ ধরনের স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে আইন ও বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষ ভূমিকাই কেবল সামাজিক শান্তি নিশ্চিত করতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ