প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
প্রমাণ ছাড়াই নদী দূষণের অভিযোগে ৩ মুসলিম গ্রেফতার; মেয়রের আইন লঙ্ঘন
ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে দুটি মুসলিম শিশুকে স্থানীয় একটি নদীতে গরুর মাংসের বর্জ্য ফেলার চেষ্টা করার সময় "হাতে-নাতে ধরেছেন" বলে দাবি করেছেন গাজিয়াবাদের মেয়র সুনিতা দয়াল। এই ঘটনার একটি ভিডিও মেয়রের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশের পর একটি স্থানীয় মাদ্রাসার সাথে যুক্ত তিন মুসলিম ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই নাবালকদের মুখ প্রকাশ করে হেনস্থা এবং পুলিশকে বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়ায় মেয়রের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে।ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি করেছে বিজেপি নেত্রী ও মেয়র সুনিতা দয়ালের একটি ভিডিও। গত ২৫ মে গাজিয়াবাদের ইন্দিরাপুরম এলাকার হিন্দন ব্যারেজ পরিদর্শনের সময় মেয়র সুনিতা দয়াল সাইকেলে চড়ে যাওয়া দুটি মুসলিম শিশুকে পথরোধ করেন। মেয়রের দাবি, ওই শিশুরা একটি চটের বস্তায় করে গরুর মাংসের বর্জ্য বহন করছিল এবং তা হিন্দন নদীতে ফেলার পরিকল্পনা করছিল।আইন লঙ্ঘন ও মেয়রের বকাঝকামেয়র সুনিতা দয়াল তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে এই ঘটনার একটি ভিডিও শেয়ার করেন। ভারতের জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট (Juvenile Justice Act) বা শিশু বিচার আইন অনুযায়ী অপরাধে জড়িত বা অভিযুক্ত নাবালকদের মুখমণ্ডল আড়াল বা ব্লার করা বাধ্যতামূলক হলেও, এই ভিডিওতে শিশুদের মুখ স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে, যা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।ভিডিওতে মেয়রকে শিশুদের বকাঝকা করতে এবং বলতে শোনা যায়, “এরা এই দেশেরই খাবে আবার এখানেই নোংরা করবে।” এছাড়া কোনো সত্যতা বা ল্যাব পরীক্ষার প্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবি করেন যে শিশুরা এটি গরুর মাংস বলে স্বীকার করেছে। শিশুদের মগজ ‘পাথর’ হয়ে গেছে উল্লেখ করে মেয়র সুনিতা দয়াল হুমকি দিয়ে বলেন, “এই মাদ্রাসায় যদি আমি তালা না ঝুলাই, তবে আমার নাম সুনিতা দয়াল নয়।”পুলিশকে চাপ ও বরখাস্তের হুমকিঘটনার পর মেয়র পুলিশ ডেকে শিশুদের হেফাজতে নেওয়ার দাবি জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপর একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে বলছেন, যদি এই শিশুদের ছেড়ে দেওয়া হয় তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত বা সাসপেন্ড করা হবে। সমালোচকরা বলছেন, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ বা যাচাইকরণ ছাড়াই পুলিশকে এভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।চাপে পুলিশের পদক্ষেপমেয়রের এই অভিযোগ ও তীব্র চাপের মুখে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ স্থানীয় একটি মাদ্রাসার সাথে জড়িত তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— জুবায়ের, আইজাজ এবং শোয়েব। সহকারী পুলিশ কমিশনার (ACP) অভিষেক শ্রীবাস্তব জানান, এই তিন ব্যক্তি শিশুদের বর্জ্যগুলো ফেলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) এর অধীনে মামলা করা হয়েছে। ধারাগুলো হলো:ধারা ২৭১: জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে এমন সংক্রমণ ছড়াতে পারে এমন অবহেলামূলক কাজ (সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড)।ধারা ২৭২: ক্ষতিকারক উদ্দেশ্যে জীবনহানির সংক্রমণ ছড়ানোর কাজ (সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড)।ধারা ২৭৯: জনসাধারণের ব্যবহারের জলাশয় বা নদীর পানি দূষিত করা (সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড)।পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, মাংসটি আসলেই গরুর মাংস কিনা তা জনসমক্ষে বা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কোনো প্রমাণ দ্বারা যাচাই করা হয়নি। তবে তারা এই ঘটনার জন্য নাবালক শিশুদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। ২০২৩ সালে নির্বাচিত হওয়া বিজেপি নেত্রী সুনিতা দয়ালের এই অন্যায্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের বিরুদ্ধে দেশের মানবাধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক বিরোধীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।এই ঘটনাটি মানবাধিকার এবং আইনি কাঠামোর গুরুতর লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুলেছে। প্রথমত, ভারতের 'জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট' (নাবালক বিচার আইন) অনুযায়ী কোনো অপরাধের সাথে জড়িত বা অভিযুক্ত শিশুর পরিচয় বা মুখমণ্ডল প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। মেয়র তার ফেসবুক ভিডিওতে শিশুদের মুখ ব্লার (অস্পষ্ট) না করে এই আইন সরাসরি লঙ্ঘন করেছেন।দ্বিতীয়ত, ভিডিওতে মেয়রকে বলতে শোনা যায়,"এদের মগজ পাথরের মতো হয়ে গেছে... এই মাদ্রাসায় যদি আমি তালা না ঝোলাতে পারি, তবে আমার নাম নেই।"মানবাধিকার কর্মী এবং সমালোচকদের মতে, কোনো তদন্ত ছাড়াই একটি পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের হুমকি এবং পুলিশকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখিয়ে চাপের মুখে গ্রেফতার নিশ্চিত করা আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।সুনীতা দয়াল ক্ষমতাসীন দল বিজেপির একজন প্রভাবশালী নেত্রী এবং ২০২৩ সাল থেকে গাজিয়াবাদের মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। ভারতে গো-মাংস বা গরুর মাংস বহন ও জবাই সংক্রান্ত বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর আগেও বিভিন্ন সময় কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়াই কেবল সন্দেহের বশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চড়াও হওয়া এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার একাধিক নজির রয়েছে।নদী বা পরিবেশ দূষণ রোধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ প্রশাসনের রয়েছে। তবে একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধি কর্তৃক প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগ তোলা, আইন নিজের হাতে নেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার এই ঘটনাটি নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা ও সাম্যের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ