প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
ট্রেনে হামলার পর নিখোঁজ মাদরাসা ছাত্র ফয়জান অবশেষে আসামের গুয়াহাটি থেকে উদ্ধার
উত্তরপ্রদেশের মউ জেলার একটি মাদরাসা থেকে ঈদুল আজহার ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে চলন্ত ট্রেনে উগ্রপন্থীদের মারধরের শিকার হওয়া নিখোঁজ ছাত্র ফয়জান রজা (২০) অবশেষে সঠিক-সালামতে তার বাড়িতে ফিরে এসেছেন। ট্রেনের ভেতর হামলার পর রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং বাবার ফোনে ‘আব্বু, সবাই আমাকে মারছে’ বার্তা পাঠানোর পর এই তরুণকে নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় ছিল তার পরিবার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদের পর শেষমেশ আসামের গুয়াহাটি থেকে উদ্ধার হয়ে তিনি বিহারের গোপালগঞ্জের বাড়িতে ফিরেছেন।ভারতের বিহার রাজ্যের গোপালগঞ্জ জেলার ফুলওয়ারিয়া থানা এলাকার চুরামন চক ভাতওয়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফয়জান আহমদ শাহ (ফয়জান রজা)। তিনি উত্তরপ্রদেশের মউ জেলায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা ‘দারুল উলুম আমজদিয়া ঘোষি’র (জামিয়া আমজাদিয়া ঘোষি মাদরাসা) একজন শিক্ষার্থী। গত সোমবার (২৫ মে) আসন্ন ঈদুল আজহার ছুটিতে পরিবারের সাথে ঈদ কাটানোর উদ্দেশ্যে মউ জংশন থেকে ‘পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেস’ ট্রেনে চড়ে তিনি বিহারের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন।চলন্ত ট্রেনে নৃশংস হামলা ও বাবার কাছে শেষ বার্তাট্রেনটি বেলথারা রোড পার হয়ে সালেমপুর স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছালে চলন্ত ট্রেনের ভেতর একদল উগ্রপন্থী বা চরমপন্থী লোক ফয়জানের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তার ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা ও মারধর শুরু করে। এই নৃশংস হামলার শিকার হয়ে ফয়জান অত্যন্ত গোপনে তার বাবা, সরকারি স্কুল শিক্ষক ইমতিয়াজ আহমদ শাহের হোয়াটসঅ্যাপ মোবাইলে একটি চরম আতঙ্কের বার্তা (ডিস্ট্রেস মেসেজ) পাঠান। মেসেজে ফয়জান লিখেছিলেন:“আব্বু, একটা ঝামেলা হয়েছে… ট্রেনের ভেতর লড়াই হয়ে গেছে, সব মারছে… আমি লুকিয়ে লুকিয়ে আপনাকে মেসেজ পাঠাচ্ছি।”এই বার্তা পাওয়ার সাথে সাথেই ইমতিয়াজ আহমদ শাহ আতঙ্কিত হয়ে ফয়জানকে পরবর্তী স্টেশনেই নেমে যাওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু এর পরপরই ফয়জানের মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ সুইচড অফ হয়ে যায় এবং তিনি রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন।পরিবারের আতঙ্ক ও সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে চলন্ত ট্রেনে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে মুসলিমদের ওপর হামলা ও হত্যার একাধিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে—যেমন সম্প্রতি বেরেলী থেকে বাড়ি ফেরার পথে মাওলানা তৌসিফের ওপর ট্রেনের ভেতর হামলা ও পরবর্তীতে রেল ট্র্যাকে তার লাশ পাওয়ার ঘটনা—ফয়জানের পরিবার চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফয়জানকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলেও তাদের মনে গভীর সংশয় জাগে। এই ঘটনায় পরিবার ভেঙে পড়ে এবং বিহারের ফুলওয়ারিয়া থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি ও লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। ফুলওয়ারিয়া থানার স্টেশন হাউস অফিসার (SHO) কুন্দন কুমার রেলওয়ে পুলিশ (GRP) ও রেলওয়ে সুরক্ষা বল (RPF)-কে সাথে নিয়ে যৌথ তদন্ত শুরু করেন। একই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ফয়জানের সুরক্ষার দাবিতে এবং এই উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।গুয়াহাটি থেকে সফল উদ্ধার ও ঘরে ফেরাতদন্ত ও অনুসন্ধানের একপর্যায়ে নিখোঁজ হওয়ার বেশ কিছু সময় পর ফয়জানের ফোনটি ক্ষণিকের জন্য চালু হলে পরিবারের সদস্যরা তার সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন। ফয়জান অত্যন্ত আতঙ্কিত কণ্ঠে জানান যে তিনি আসামের গুয়াহাটিতে রয়েছেন এবং ট্রেনের ওই ভয়াবহ হামলার পর তার ‘মস্তিষ্ক বা বুদ্ধি ঠিকমতো কাজ করছে না’ (দিমাগ কাম নেহি কর রাহা হ্যায়)। গুয়াহাটিতে পরিবারের কিছু পরিচিত লোক থাকায় ইমতিয়াজ আহমদ শাহ ফয়জানকে সেখানেই অবস্থান করার নির্দেশ দেন।অবশেষে সমস্ত আতঙ্ক ও আশঙ্কার অবসান ঘটিয়ে আসামের গুয়াহাটি থেকে সঠিক-সালামতে ও অক্ষত অবস্থায় বিহারের গোপালগঞ্জের নিজ গ্রাম চুরামন চক ভাতওয়ালিয়ায় ফিরে এসেছেন ফয়জান রজা। তার এই নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে পরিবারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীরা ফয়জানের সন্ধান ও সুরক্ষায় তৎপরতার জন্য পুলিশ-প্রশাসন এবং রেলওয়ে বিভাগকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তবে গণপরিবহনে সংখ্যালঘু ও সাধারণ যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো পুনরায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।এর আগেও ভারতের বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনে মুসলিম পরিচয়ধারী যাত্রীদের ওপর সহযাত্রী বা উগ্রবাদী দল কর্তৃক মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতনের একাধিক ঘটনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টে উঠে এসেছে। পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসের এই রুটটিতেও প্রায়শই নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ তোলেন সাধারণ যাত্রীরা।ফয়জান রজার অক্ষত ফিরে আসা স্বস্তিদায়ক হলেও, চলন্ত ট্রেনে একজন শিক্ষার্থীর ওপর হামলার ঘটনাটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উচিত ট্রেনের ভেতরের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবৃতির ভিত্তিতে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, যাতে ভবিষ্যতে গণপরিবহনে এমন ভীতিকর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ