প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
চুরির অপবাদে গাছে বেঁধে নির্যাতন: ১৪ বছরের দলিত কিশোরীকে চুল ধরে গ্রাম ঘোরানোর অভিযোগ
ভারতের উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলায় চুরির অপবাদে ১৪ বছর বয়সী এক দলিত কিশোরীকে গাছে বেঁধে নির্যাতন এবং চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে পুরো গ্রাম ঘোরানোর এক নৃশংস ঘটনা সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। পুলিশ অভিযুক্ত দোকানদারকে গ্রেপ্তার করলেও দলিত সম্প্রদায়ের উপর উচ্চবর্ণের এই জাতিগত সহিংসতা ভারতে মানবাধিকার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।ভারতের উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলার তারকুলওয়া থানা এলাকার মিশ্রৌলি (চাকজাগবান্ধান) গ্রামে গত ৩১ মে এক ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় এক মুদি দোকানদার হারিকেশ গুপ্তা, ওই ১৪ বছর বয়সী নাবালিকা দলিত কিশোরীর বিরুদ্ধে তার দোকান থেকে মালামাল চুরির অভিযোগ তোলেন।অভিযোগের ভিত্তিতে কিশোরীটিকে চরমভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের দাবি, অভিযুক্ত হারিকেশ গুপ্তা প্রথমে মেয়েটির চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে অপমানজনকভাবে পুরো গ্রাম ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ায়। এরপর নিজের বাড়ির সামনে একটি নিম গাছের সাথে রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে তাকে নির্মমভাবে মারধর ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।ভিডিও ভাইরাল ও তীব্র ক্ষোভঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা গ্রামবাসীদের একজন পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করলে তা দ্রুত ভাইরাল হয়। ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যায়, অসহায় কিশোরীটিকে রশি দিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং চারপাশে বহু মানুষ নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুধু মারধরই নয়, ওই নাবালিকাকে চরম বর্ণবাদী ও জাতিগত গালিগালাজ (Casteist slurs) করা হয় বলে জানা গেছে। ইন্টারনেট দুনিয়ায় এই ভিডিওটি প্রকাশের পর দলিত সম্প্রদায়ের প্রতি উচ্চবর্ণের মানুষের এমন অমানবিক আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।পুলিশি তৎপরতা ও উদ্ধারজরুরি হেল্পলাইন নম্বর '১১২'-এ কল পেয়ে দেওরিয়া জেলা পুলিশ দ্রুত মিশ্রৌলি গ্রামে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং ভুক্তভোগী ১৪ বছর বয়সী দলিত কিশোরীকে উদ্ধার করে। ঘটনার পরদিনই, অর্থাৎ ১ জুন অভিযুক্ত দোকানদার হারিকেশ গুপ্তাকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS) এবং ‘তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি (নির্যাতন প্রতিরোধ) আইন’ (SC/ST Act)-এর প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।সার্কেল অফিসার সুনীল কুমার রেড্ডি এক ভিডিও বার্তায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, "চুরির সন্দেহে এক কিশোরীকে জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের খবর পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা করে আইনি প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।"দলিত অধিকার কর্মীদের প্রতিক্রিয়াএই বর্বরোচিত ঘটনার পর ভারতের দলিত কর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছে। সামাজিক কর্মী রবি পারমার ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘এক্স’ (টুইটার)-এ লিখেছেন, "অভিযুক্ত যদি উচ্চবর্ণের আর ভুক্তভোগী যদি দলিত হয়, তবে এই দেশে সেটিকে অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হয় না। স্বাধীন ভারতেও দলিতদের দাসের মতো জীবন যাপন করতে বাধ্য করা হচ্ছে।"অন্য এক বর্ণবাদ বিরোধী কর্মী সূরয কুমার বৌদ্ধ প্রশ্ন তুলে বলেন, "এই দেশে দলিতদের জন্য কি কোনো সরকার, বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা বা শিশু ও মানবাধিকার কমিশন আছে, নাকি সব প্রতিষ্ঠান শুধু উচ্চবর্ণের স্বার্থ রক্ষার জন্য?"
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ