প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
যুক্তরাজ্যে ইসলাম গ্রহণের পর পরিবারচ্যুত নারীদের আশ্রয় ‘সোলেস’: এক নির্ভীক যাত্রার গল্প
যুক্তরাজ্যে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর তীব্র পারিবারিক ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন আলিয়াহ উম্ম রায়ান। ১৭ বছর বয়সে উগ্র ইসলামোফোবিক সৎ বাবার প্ররোচনায় নিজের মা-ই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। চরম একাকীত্ব, গৃহহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সোলেস ইউকে’ (Solace UK) নামের একটি অনন্য দাতব্য সংস্থা।যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা আলিয়াহ উম্ম রায়ান বর্তমানে ‘সোলেস ইউকে’-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। সম্প্রতি আনাদোলু এজেন্সিকে (AA) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ১৯৯৯ সালে তার ইসলাম গ্রহণের পর থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ সংগ্রাম, নওমুসলিম নারীদের মনস্তাত্ত্বিক সংকট এবং তাদের পাশে নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।সন্দেহ থেকে সত্যের সন্ধানউম্ম রায়ান জানান, তিনি শুরুতে ইসলাম ধর্মের মধ্যে ‘ভুল ও অসঙ্গতি’ খোঁজার উদ্দেশ্যেই পড়াশোনা শুরু করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে তার ধারণা ছিল ইসলাম আধুনিক যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কিন্তু পবিত্র কুরআন গভীরভাবে পড়ার পর তার সেই ভুল ভেঙে যায় এবং তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন।১৭ বছর বয়সে গৃহহীন ও নিঃস্ব হওয়ার গল্পউম্ম রায়ান যখন মুসলিম হন, তখন যুক্তরাজ্যে কোনো নতুন মুসলিম খুঁজে পাওয়া ছিল অত্যন্ত বিরল। ফলে তাকে চরম একাকীত্বের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে তার পরিবার থেকে। তার মা সে সময় একজন চরম বর্ণবাদী এবং ইসলামোফোবিক (ইসলামভীতিতে আক্রান্ত) ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিলেন। সেই ব্যক্তির প্ররোচনায় উম্ম রায়ানের মা নিজের সন্তানকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেন।উম্ম রায়ান বলেন:"১৭ বছর বয়সে মা আমাকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলেন এবং আমার সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আচমকা আমি নিজেকে এমন এক পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করলাম, যেখানে আমার থাকার কোনো জায়গা ছিল না, কোনো চাকরি ছিল না। বাধ্য হয়ে পড়ালেখা ছেড়ে বেঁচে থাকার জন্য আমাকে কাজে নামতে হয়েছিল।"‘শাহাদাহ’ মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যায় না২০০৬ সালের রমজান মাসে নিজের ফেলে আসা ১০ বছরের কষ্টের কথা ভেবে উম্ম রায়ানের মাথায় ‘সোলেস ইউকে’ প্রতিষ্ঠার ধারণা আসে। তিনি উপলব্ধি করেন, অনেক ইসলামিক প্রতিষ্ঠান নতুন মুসলিমদের নামায, কুরআন বা বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়গুলো শেখালেও পরিবার কর্তৃক প্রত্যাখ্যান, একাকীত্ব, আর্থিক অনটন এবং মানসিক ট্রমার মতো বাস্তব সংকটে পাশে দাঁড়ায় না।তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের (শাহাদাহ পাঠ) মাধ্যমে তার সংকটের শেষ হয় না, বরং সেখান থেকেই একটি নতুন ও সংবেদনশীল জীবনের যাত্রা শুরু হয়। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত সোলেস ইউকে আজ ১৫ বছর ধরে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।পরিচয় সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক চাপইসলাম গ্রহণের পর একজন নারীর পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, বন্ধুমহল এবং সামাজিক জীবন পুরোপুরি বদলে যায়। মুসলিম সমাজ অনেক সময় ভালো উদ্দেশ্যে হলেও নতুন বোনদের কাছ থেকে রাতারাতি আমূল পরিবর্তন আশা করে, যা তাদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।উম্ম রায়ান চমৎকার একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পবিত্র কুরআন দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হয়েছিল। সব বিধান একবারে এলে তৎকালীন নতুন মুসলিমদের জন্য তা বহন করা কঠিন হতো। কিন্তু বর্তমান যুগে নওমুসলিম ভাই-বোনদের ক্ষেত্রে সমাজ প্রায়ই এই ধাপে ধাপে পরিবর্তনের বিষয়টি ভুলে যায়। এমনকি ১০-১৫ বছর মুসলিম থাকার পরও অনেকে গভীর পরিচয় সংকটে ভোগেন।সোলেস ইউকে-এর সেবাএই সংস্থার বিশেষত্ব হলো, এর অধিকাংশ কর্মীই নিজেরা এক সময় ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামে এসেছেন, ফলে তারা আবেদনকারীদের দুঃখ-কষ্ট গভীরভাবে বুঝতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ওয়ান-টু-ওয়ান (ব্যক্তিগত) ওয়ান-স্টপ সাপোর্ট দিয়ে থাকে:মানসিক স্বাস্থ্য: বিনামূল্যে পেশাদার মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং ও থেরাপি।জরুরি আবাসন: পরিবারচ্যুত ও গৃহহীন নারীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং আর্থিক অনুদান।পারিবারিক মধ্যস্থতা: অমুসলিম পরিবারের সাথে ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে আইনি ও সামাজিক মধ্যস্থতা এবং বিবাহ সহায়তা।বিশেষায়িত কর্মসূচি: একক মায়েদের (সিঙ্গেল মাদার) জন্য বিশেষ গাইডেন্স এবং রমজানে ইফতার ও ঈদের আয়োজন।ওসিয়তনামা (উইল) সেবা: অনেক সময় অমুসলিম পরিবার মৃত মুসলিম নারীর মরদেহ ইসলামি শরিয়াহ বহির্ভূতভাবে সৎকার করতে চায়। সোলেস ইউকে আইনি নথির মাধ্যমে মৃত মুসলিম বোনদের জানাজা ও দাফন নিশ্চিত করে।সবশেষে উম্ম রায়ান বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনার চারপাশে যদি কোনো নওমুসলিম থাকেন, তবে তাদের প্রতি দয়া, ক্ষমা ও চরম ধৈর্যশীল আচরণ প্রদর্শন করুন। কারণ এটি তাদের একটি দীর্ঘ ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক লড়াই।যুক্তরাজ্যের আইনি কাঠামো অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষার কথা বলা হলেও, ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা প্রায়শই অদৃশ্য সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন। মানবাধিকার ও সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো ব্যক্তির ধর্ম বিশ্বাসের কারণে পরিবার বা সমাজ কর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়া তার মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। উম্ম রাইয়ান ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বলেন, পবিত্র কোরআন একবারে নাজিল হয়নি, বরং ধাপে ধাপে এসেছে। অথচ বর্তমান সমাজ নতুন মুসলিমদের ওপর রাতারাতি আমূল পরিবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যা তাদের অধিকার ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম কমিউনিটি এবং সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো নাগরিক যেন মৌলিক অধিকার, আবাসন বা সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই দায়িত্ব।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ