প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
বিয়ের সাজে আর সাজা হলো না: যুদ্ধবিরতির মাঝেই হামলায় প্রাণ হারালেন তরুণ বর
গাজা উপত্যকায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির তোয়াক্কা না করেই ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনুসে আবারেও ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এই নির্মম হামলায় বিয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি বর মুুহান্নদ ফারওয়ানা। জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিনটি উদযাপনের পরিবর্তে আজ এই তরুণের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ায় পুরো গাজায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।নতুন জীবনের পা রাখার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটির জন্য। কিন্তু গাজা উপত্যকার শত শত তরুণের মতো খান ইউনুসের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী মুুহান্নদ ফারওয়ানার স্বপ্নকেও পিষে দিল ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। আজ (৭ জুন) ভোরে বিয়ের সানাই বাজার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক হামলায় প্রাণ হারান এই হবু বর।সীমাবদ্ধ সম্পদ আর চরম প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের পরিবারের বসতবাড়ির ছাদের ওপর একটি তাবু টাঙিয়ে নতুন সংসার গোছানোর চেষ্টা করছিলেন মুুহান্নদ। কিন্তু আজ ভোরে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ তার সমস্ত চেষ্টা ও স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। বিয়ের বাসর ঘরের পরিবর্তে মুহান্নাদের ঠিকানা হলো অন্ধকার কবর। তার ঘর জুড়ে এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নতুন বিয়ের স্যুট, পোশাক, ফুল আর ধবংসাবশেষ।আমার ছেলে এখন জান্নাতের বরমুহান্নাদের অকাল মৃত্যুতে তার মা মুনিরা ফারওয়ানার আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। ছেলের বিয়ের নতুন পোশাকটি বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন,"সে তার সব গোছগাছ শেষ করেছিল। আমরা অত্যন্ত আনন্দের সাথে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বড় ছেলে, আমার চোখের মণি বিয়ে করবে বলে আমরা কতটা খুশি ছিলাম! আমাদের এই বিপুল আনন্দ যে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় মাটির সাথে মিশে মাতমে রূপ নেবে, তা ভাবতেও পারিনি।"কান্নাভেজা কণ্ঠে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে মা মুনিরা বলেন, "সে হয়তো ইহজগতে বর হতে পারল না, তবে ইনশাআল্লাহ সে এখন জান্নাতের বর।"তিনি জানান, বিয়ের আগের দিন সন্ধ্যায় মুহান্নাদ তার বন্ধুদের সাথে দারুণ আনন্দ করেছিলেন। সেই উৎসবের ভিডিও দেখিয়ে মা প্রশ্ন তোলেন, "ইসরায়েল আমাদের সাথে এমন কেন করছে? তারা বলছে যুদ্ধবিরতি চলছে, অথচ হামলা তো এক মুহূর্তের জন্যও থামছে না! আমরা তো কোনো সংঘর্ষের সীমানার কাছাকাছিও নেই, আমাদের দ্বারা কারও কোনো ক্ষতিও হয়নি। তাহলে কেন আমাদের ওপর এই নিষ্ঠুরতা?"ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সুখ সহ্য করতে পারে নামুহান্নাদের ভগ্নিপতি মুহাম্মদ আল-কুদরা গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুহান্নাদ যখন তার নতুন জীবনের রঙিন স্বপ্ন বুনছিল, ঠিক তখনই ইসরায়েলি বাহিনী তাকে ও তার সাথে পুরো পরিবারের সুখকে চিরতরে হত্যা করেছে।বিয়ের দিনেই যার জানাজা পড়তে হলো, সেই মুহান্নাদের চাচা হাসান ফারওয়ানা নিজেদের মানসিক ধাক্কা ও কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, "গতকালও আমরা ভীষণ খুশি ছিলাম, সবাই মিলে বিয়ের আমেজ উদযাপন করেছি। মুহান্নাদ অধীর আগ্রহে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু গাজাবাসীর নিয়তিই এমন। ইসরায়েল চায় না আমরা কখনো সুখী হই।"চাচা হাসান আরও যোগ করেন, কাগজে-কলমে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই; প্রতিদিনই ইসরায়েলি বাহিনী গাজাবাসীর ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় গাজায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও মাঠপর্যায়ে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না—এই ঘটনা তারই একটি নির্মম উদাহরণ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চলাকালীন বা যেকোনো পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিক এবং তাদের আবাসস্থলকে লক্ষ্যবস্তু করা স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধের শামিল।মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাব এবং নির্বিচার হামলার সমালোচনা করে আসছে। এই ঘটনায় "যুদ্ধবিরতি" থাকা সত্ত্বেও কেন এবং কীসের ভিত্তিতে একটি জনবসতিপূর্ণ বাড়িতে হামলা চালানো হলো, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জবাবদিহিতার প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।যুদ্ধবিরতির চুক্তি কাগজে-কলমে কার্যকর থাকলেও গাজার সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রতিফলন এখনো অনিশ্চিত। মুহেন্নেদ ফারওয়ানার মতো তরুণের অকাল মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নই ধ্বংস করেনি, বরং আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তি চুক্তির কার্যকারিতাকে আবারও বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ