প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুন ২০২৬
আসামে গরু চুরির মিথ্যা অপবাদে দুই মুসলিম তরুণকে গণপিটুনি ও এয়ারগান দিয়ে গুলি
ভারতের আসামের দক্ষিণ অঞ্চলের শ্রীভূমি (পূর্বতন করিমগঞ্জ) জেলার পাথারকান্দিতে গরু চুরির মিথ্যা অপবাদে দুই মুসলিম তরুণকে উগ্র হিন্দু জনতা কর্তৃক নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং এয়ারগান দিয়ে গুলি করে গুরুতর আহত করার ঘটনা ঘটেছে। গত ১ জুন রাতের এই ঘটনায় ভুক্তভোগী দুই ভাই বর্তমানে শিলচর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এই ঘটনার বিভীষিকাময় ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দি থানার অন্তর্গত মামবারি গ্রামের দুই সিলেটি ভাষী মুসলিম তরুণ—১৭ বছর বয়সী মাদ্রাসা ছাত্র আমির উদ্দিন এবং তার চাচাতো ভাই ১৮ বছর বয়সী দিনমজুর ইসলাম উদ্দিন। গত ১ জুন সোমবার, নিজেদের হারিয়ে যাওয়া গরু খুঁজতে গিয়ে তারা পার্শ্ববর্তী নালুগাঁও নামক একটি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সম্প্রদায়ের উগ্র মব বা জনতার নৃশংস আক্রমণের শিকার হন।ঘটনার সূত্রপাত ও নির্মম নির্যাতনভুক্তভোগীদের চাচা নাজিম উদ্দিনের ভাষ্যমতে, মামবারি গ্রামটি বন্যাপ্রবণ হওয়ায় তারা নিয়মিত পাথারকান্দি বাইপাস সংলগ্ন এলাকায় নিজেদের গবাদিপশু চরাতে নিয়ে যেতেন। ঘটনার দিন বিকেলে তাদের চারটি গরু করিমগঞ্জ-আগরতলা মহাসড়কের ওপারে নালুগাঁও এলাকায় চলে যায়। সন্ধ্যায় দুই ভাই গরু খুঁজতে সেখানে গেলে একজন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ব্যক্তি তাদের গরুর সন্ধান দেন। কিন্তু পরক্ষণেই নারীসহ ১৮-১৯ জনের একটি উগ্র জনতা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ঘিরে ফেলে এবং 'গরু চোর' অপবাদ দিয়ে টানা দুই ঘণ্টা ধরে অমানুষিক নির্যাতন চালায়।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, উগ্র জনতার কয়েকজন আমির ও ইসলামকে শক্ত করে ধরে রেখেছে এবং একজন ব্যক্তি অত্যন্ত কাছ থেকে তাদের লক্ষ্য করে এয়ারগান দিয়ে একের পর এক গুলি ছুঁড়ছে। এই সময় ওই দুই তরুণকে বাঁচার আকুতি জানিয়ে "আল্লাহ, আল্লাহ" এবং "ও মাই" (ও মা) বলে চিৎকার করতে দেখা যায়।শারীরিক অবস্থানাজিম উদ্দিন যখন তাদের উদ্ধার করতে যান, তখন তাকেও মারধর করা হয়। তিনি জানান, চিকিৎসকদের এক্স-রে রিপোর্ট অনুযায়ী দুই ভাইয়ের শরীরের গভীরে ৫ থেকে ৬টি এয়ারগানের ছররা গুলি (পেলট) ঢুকে রয়েছে। ইসলামের বুকে এবং আমিরের কুচকিতে এখনো গুলি আটকে আছে। বর্তমানে তারা শিলচর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।পুলিশের ভূমিকা ও গ্রেফতারগত ৩ জুন ভুক্তভোগী পরিবার পাথারকান্দি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। প্রথমে ভিডিও দেখে ৩ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও পরবর্তীতে ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই সাথে উগ্র জনতা তাদের গরুগুলোও ছিনতাই করে নিয়ে গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।পাথারকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইন্সপেক্টর মানসজ্যোতি বোড়ো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। করিমগঞ্জ জেলা পুলিশ এই ঘটনায় মূল শুটারসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং ভেঙে ফেলা এয়ারগানের অংশবিশেষ উদ্ধার করেছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১২৬(২) (অন্যায়ভাবে আটকে রাখা), ১৯১(২) (দাঙ্গা), ১০৯ (হত্যার চেষ্টা), ১১৭(২) (গুরুতর আঘাত করা), ১১৫(২) (স্বেচ্ছায় আঘাত করা) এবং ৩০৩(২) (চুরি) ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পূর্বতন রেকর্ডবরাক উপত্যকার মুসলিমদের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও পুলিশ এটিকে সাম্প্রদায়িক রূপ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তবে চাচা নাজিম উদ্দিন বলেন, "আক্রমণকারীরা ওদের আগে থেকেই চিনত। ইসলাম মাঝেমধ্যেই ওই এলাকায় কাজ করতে যেত। আমাদের বারবার আশ্বাস ও গরুগুলো যে আমাদের তার প্রমাণ দেওয়ার পরেও যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে কেবল মুসলিম পরিচয়ের কারণেই তাদের টার্গেট করা হয়েছে।"উল্লেখ্য, আসামে গরু চুরির অপবাদে গণপিটুনির ঘটনা এটিই প্রথম নয়। গত ২৪ মে-ও সোনিতপুর জেলায় দুই মুসলিম ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণ সংস্থা 'ACLED'-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে গো-রক্ষা আইন কঠোর করার পর থেকে আসামে ডজনেরও বেশি এমন গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ