প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
উত্তরপ্রদেশে তথাকথিত ধর্মান্তরের অভিযোগে পিতা-কন্যা গ্রেফতার, স্বেচ্ছায় মুসলিম হওয়ার দাবি যুবকের
ভারতের উত্তর প্রদেশের শামলী জেলায় কথিত জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের অভিযোগে চাঁদনী কুরেশি এবং তার বাবা ইসলাম কুরেশিকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। এই ঘটনায় একই পরিবারের সদস্য এবং তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এই তীব্র বিতর্কের মাঝেই ভুক্তভোগী দাবি করা যুবক আয়ুষ মালিক এক ভিডিও বার্তায় নিজেকে স্বেচ্ছায় মুসলিম দাবি করে পরিবারের অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন।উত্তর প্রদেশের শামলী জেলায় তথাকথিত ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ’ ও বিয়ের অভিযোগে এক মুসলিম তরুণী ও তার বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ওষুধ ব্যবসায়ী দেবরাজ মালিকের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ এই পদক্ষেপ নেয়। দেবরাজ মালিকের অভিযোগ, তার ৩০ বছর বয়সী ছেলে আয়ুষ মালিককে চাঁদনী কুরেশির সাথে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কয়েক বছর আগে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় তদন্ত চলছে এবং বাকি অভিযুক্তদের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।থানায় দায়ের করা অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আয়ুষকে কৌশলে দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে জাল নথিপত্র ব্যবহার করে নিকাহ (বিয়ে) পড়ানো হয়। অভিযোগকারীর মতে, এই ধর্মান্তরকরণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে এবং সময়ের সাথে সাথে মানসিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে।পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে চাঁদনীর ভাই পূর্বে আয়ুষের ওষুধের দোকানে কাজ করতেন এবং সেই সূত্রে দুটি পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। এছাড়া চাঁদনী একটি জিমে ভর্তি হয়েছিলেন যেখানে আয়ুষও যেতেন, এবং সেখান থেকেই মূলত তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে যে, কিছু ব্যক্তিগত ভিডিওর অপব্যবহার করে পরবর্তীতে আয়ুষকে ধর্ম পরিবর্তনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তবে পুলিশ স্পষ্ট করেছে যে, এই অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে এবং আদালতে এখনও তা প্রমাণিত হয়নি।আমি একজন মুসলিমএই তুমুল বিতর্কের মধ্যে, আয়ুষ মালিক (যিনি বর্তমানে নিজের নাম 'মোহাম্মদ আলী' বলেও পরিচয় দেন) প্রকাশ্য এক ভিডিও বিবৃতিতে নিজের ধর্মীয় অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম।”অন্য ধর্মে ‘প্রত্যাবর্তন’ বা ‘ঘর ওয়াপসি’র সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি যদি ধর্মান্তরিত হয়েই থাকি, তবে ‘প্রত্যাবর্তন’ শব্দের অর্থ কী? আমি যদি পুনরায় হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতাম, তবেই কেবল প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন উঠত।”আয়ুষ আরও প্রকাশ করেন যে, তিনি বর্তমানে তীব্র সামাজিক ও পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে যে এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে, তা মূলত বহিরাগত বা সামাজিক চাপের কারণেই করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।আমি কোনো চাপের শিকার নইপরিবারের করা সমস্ত দাবি প্রত্যাখ্যান করে আয়ুষ বলেন যে, তার এই বক্তব্য কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা চাপের মুখে দেওয়া নয়। তিনি মনে করেন, এই পুরো বিষয়টি কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা বা সহানুভূতির বিষয় নয়, বরং আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের সমাজ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়—এটি তারই বহিঃপ্রকাশ।তিনি আরও যোগ করেন, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণের সময় তিনি কখনও কোনো বৈষম্যের শিকার হননি এবং দেশের মানুষের প্রতি তার বিশ্বাস এখনও অটুট রয়েছে। তার মতে, “মানুষকে তার অঞ্চল বা ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে বিচার করা উচিত নয়, বরং তার চরিত্র দিয়ে বিচার করা উচিত।”শামলী জেলা পুলিশ জানিয়েছে যে, মামলার তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলছে এবং খুব শীঘ্রই আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। ঘটনার সত্যতা ও পরম্পরা সঠিকভাবে উদঘাটনের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ডিজিটাল প্রমাণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখছে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে এখন পর্যন্ত ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং বাকি আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।ভারতের উত্তরপ্রদেশে "জোরপূর্বক ধর্মান্তর বিরোধী আইন" অত্যন্ত কঠোর হওয়ায় প্রায়শই আন্তঃধর্মীয় বিয়ের ক্ষেত্রে এ ধরনের আইনি জটিলতা ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো অতীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, প্রাপ্তবয়স্কদের নিজস্ব পছন্দের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকে।নাগরিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতের সংবিধান প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিককে নিজস্ব ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে এই মামলায় পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা 'জাল নথিপত্র' ও 'ব্ল্যাকমেইলিং'-এর অভিযোগগুলো এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ডিজিটাল প্রমাণ, আর্থিক লেনদেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য পরীক্ষা করছে। মামলার সত্যতা পুরোপুরি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে।তদন্তকারী সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, উভয় পরিবার আগে থেকেই একে অপরকে চিনত। যুবকের দোকানে অভিযুক্ত পরিবারের এক সদস্যের কর্মসংস্থান এবং পরবর্তীতে স্থানীয় জিমে তাদের নিয়মিত যাতায়াত থেকেই সম্পর্কের সূত্রপাত, যা পরবর্তীতে বিবাহ এবং ধর্ম পরিবর্তনের দিকে গড়ায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ