প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬
ভারতে রাস্তা প্রশস্তকরণের নামে পুরোনো নূরানী মসজিদ উচ্ছেদ
ভারতের রাজস্থানের জয়পুরের মালব্য নগরে রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের নাম করে ৪৪ বছরের পুরোনো ‘নূরানী মসজিদ’ উচ্ছেদের কাজ শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ১৯৮১ সালে নির্মিত এই ধর্মীয় উপাসনালয়টি ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও আইন-শৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কায় ওই এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের পাশাপাশি ৩ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।রাজস্থানের জয়পুরের মালব্য নগরে বছরের পর বছর ধরে চলে আসা তীব্র যানজট নিরসনে রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে জয়পুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (জেডিএ)। এই প্রকল্পের আওতায় গত রবিবার (৭ জুন, ২০২৬) থেকে ৪৪ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক ‘নূরানী মসজিদ’ উচ্ছেদের এক বিতর্কিত অভিযান শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। রাস্তা চওড়া করার এই প্রকল্পের আওতায় শুধু এই মসজিদটিই নয়, একটি মাজার, দুটি ছোট মন্দির এবং একটি সৎসঙ্গ ভবনসহ বেশ কয়েকটি ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদের তালিকায় রাখা হয়েছে।৩,০০০ পুলিশ মোতায়েন ও ইন্টারনেট বন্ধমসজিদ ভাঙার এই অভিযানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের গুজব ছড়ানো রোধে মালব্য নগরের নির্দিষ্ট কিছু অংশে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট পরিষেবা সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুরো এলাকায় প্রায় ৩,০০০ পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং অভিযানের আগে পুলিশ বাহিনী বিশেষ 'ফ্ল্যাগ মার্চ' বা মহড়া পরিচালনা করে। প্রশাসনের দাবি, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।নোটিশ দেরিতে পাওয়ার অভিযোগনূরানী মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ১৯৮১ সাল থেকে প্রায় ৩৯১ বর্গগজ জমির ওপর এই মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে এবং বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে নিয়মিত দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হয়ে আসছিল।কমিটির সদস্যরা অভিযোগ করে বলেন, "আমাদের উচ্ছেদের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে গত শুক্রবার রাতে। প্রশাসন আমাদের আইনগতভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার বা জবাব দেওয়ার মতো ন্যূনতম সময়টুকুও দেয়নি।" তারা আরও জানান, এই জমিটি জয়পুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (জেডিএ) কর্তৃক অনুমোদিত একটি হাউজিং সোসাইটির কাছ থেকে বৈধভাবে কেনা হয়েছিল।অন্যদিকে, জয়পুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (জেডিএ) এই মসজিদটিকে একটি ‘অবৈধ স্থাপনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের বক্তব্য, ওই এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য রাস্তা চওড়া করা অত্যন্ত জরুরি এবং এই স্থাপনাটি অপসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট ১৪৩টি সম্পত্তির মালিককে আগেই নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসেই ১৩৪টি অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বাকি থাকা ধর্মীয় উপাসনালয়সহ অন্যান্য স্থাপনাগুলো এই চলমান ধাপে অপসারণ করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন হিসেবে 'খোঁ নাগোরিয়ান' এলাকায় প্রায় ১,১০০ বর্গগজ বিকল্প জমি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গেছে।জেডিএ এবং স্থানীয় প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, এই উচ্ছেদ অভিযানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। নূরানী মসজিদের পাশাপাশি একই প্রকল্পের জন্য একটি মাজার, দুটি ছোট মন্দির এবং একটি সৎসঙ্গ ভবনও পর্যায়ক্রমে অপসারণ করা হচ্ছে।প্রসঙ্গত, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা এলাকায় একটি মসজিদের অংশবিশেষ উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই জয়পুর প্রশাসন এবার আগেভাগেই এই নজিরবিহীন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ