প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুন ২০২৬
বার্লিনে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মুসলিমবিদ্বেষী: এক বছরেই হামলা ও বৈষম্য ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি
জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বিগত ২০২৫ সালে মুসলিমদের লক্ষ্য করে চালানো বিভিন্ন হামলা, সহিংসতা ও বৈষম্যের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ বিরোধী জোট ‘ক্লেইম’ (CLAIM) এর প্রকাশিত এক নতুন প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বর্ণবাদী ও ইসলামভীতির এই বিস্তারকে একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন অধিকারকর্মীরা।ইউরোপের অন্যতম প্রধান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বসবাসরত মুসলিমদের জন্য দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বেসরকারি সংস্থা 'ক্লেইম' (CLAIM) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ২০২৫ সালে বার্লিনে মুসলিমদের লক্ষ্য করে অন্তত ৯৭৫টি হামলা ও তীব্র বৈষম্যের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার ঠিক ৫১ শতাংশ, যা স্থানীয় প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা।প্রতিদিনের জীবনে কাঠামোগত বর্ণবাদ ও সহিংসতাপ্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলামবিদ্বেষ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি বার্লিনের সব ধরনের সামাজিক স্তরে ছড়িয়ে পড়া একটি কাঠামোগত সমস্যা। নথিভুক্ত ৯৭৫টি ঘটনার মধ্যে রয়েছে:কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও বহিষ্কার।সরাসরি মুখের ওপর বা মৌখিকভাবে তীব্র অপমান ও হুমকি।মুসলিমদের সম্পদ ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন।বিশেষ করে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে শারীরিক সহিংসতা, যার মধ্যে প্রকাশ্য রাস্তায় হিজাব পরা নারীদের দিকে থুতু ফেলা এবং তাদের মাথা থেকে জোরপূর্বক হিজাব টেনে ছিঁড়ে ফেলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা রয়েছে।সংস্থার সহ-পরিচালক রিমা হানানো বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,"বার্লিনের বহু মানুষের কাছে ইসলামবিদ্বেষী বর্ণবাদ এখন এক প্রাত্যহিক বাস্তবতা। মুসলিমরা প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত, বৈষম্য এবং হামলার শিকার হচ্ছেন। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই এক বছরে ৬৫টি সরাসরি শারীরিক হামলার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ৮টি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও প্রাণঘাতী।"পুলিশের নথির সঙ্গে বেসরকারি তথ্যের অমিলসরকারি তথ্যের তুলনায় মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র আরও অনেক বেশি ভয়াবহ। বার্লিন পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১৬৬টি এবং ২০২৫ সালে ১৮৬টি ইসলামবিদ্বেষী অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধের একটি বিশাল অংশই পুলিশের খাতায় বা সরকারি হিসাবে শেষ পর্যন্ত নথিবদ্ধ হয় না। এর বড় কারণ হলো, ভুক্তভোগীরা প্রায়শই আইনি জটিলতা বা সামাজিক সামাজিক হেনস্থার ভয়ে অভিযোগ করতে চান না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক অধিকার সংস্থার (FRA) ২০২৪ সালের এক গবেষণা দেখায় যে, জার্মানিতে মাত্র ৪ শতাংশ ভুক্তভোগী তাদের সাথে হওয়া বৈষম্যের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, যা ইউরোপের গড় হার (৬%) থেকেও অনেক নিচে।রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ ও কৌশলগত সংস্কারের দাবিএই মারাত্মক সংকট মোকাবিলায় ক্লেইম (CLAIM) জোট সরকারের কাছে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে:১. মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘটা অপরাধগুলোর সঠিক তদন্ত, নথিবদ্ধকরণ এবং আরও কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা করা।২. সরকারি প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মীদের জন্য ইসলামবিদ্বেষী বর্ণবাদের ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা।৩. বিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্ণবাদ বিরোধী নীতি ও সচেতনতামূলক শিক্ষাক্রম জোরদার করা।৪. বার্লিন রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মুসলিমদের সুরক্ষায় একটি দীর্ঘমেয়াদী বিশেষ কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি ও তার বাস্তবায়ন।বার্লিনের শ্রম, সামাজিক বিষয়, সমতা, একীকরণ ও বৈষম্য বিরোধী সেনেটর কানসেল কিজিলতেপে এই রিপোর্টের তথ্যে গভীর বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, "বর্ণবাদের এই নগ্ন রূপটি সত্যিই স্তম্ভিত করার মতো। বার্লিনের মুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করতে এই প্রতিবেদনটিকে ভিত্তি করে আমরা অতি দ্রুত কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করব।"
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ