প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
যুক্তরাজ্যে ইমামের বাড়িতে পেট্রোল বোমা হামলা: অলৌকিকভাবে বাঁচলেন স্ত্রী ও ৪ সন্তানসহ ৭ জন
যুক্তরাজ্যের বোল্টন শহরের শার্পলস এলাকায় ৪২ বছর বয়সী স্থানীয় ইমাম হাসান প্যাটেলের বসতবাড়িতে একটি ভয়াবহ মোলোটভ ককটেল (পেট্রোল বোমা) হামলা চালানো হয়েছে। গত ১০ জুন, বুধবার স্থানীয় সময় ৯:২০ মিনিটে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় বাড়িতে ইমামের স্ত্রী, ৪ সন্তান এবং এক ভাগ্নেসহ মোট ৭ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। হামলাকারী জানালার কাচ ভেঙে জ্বলন্ত অগ্নিবোমা ভেতরে ছুড়ে মারলেও অলৌকিকভাবে পরিবারের কেউ হতাহত হননি। গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ এটিকে একটি ‘পরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে।যুক্তরাজ্যের গ্রেটার ম্যানচেস্টার কাউন্টির বোল্টন শহরে একজন মুসলিম ইমামের পরিবারকে পুড়িয়ে মারার এক নৃশংস ও পরিকল্পিত চেষ্টা চালানো হয়েছে। গত বুধবার রাতে যখন পুরো পরিবার বাড়িতে অবস্থান করছিল, তখন অজ্ঞাত এক দুর্বৃত্ত ইমাম হাসান প্যাটেলের বাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা (মোলোটভ ককটেল) নিক্ষেপ করে। এই ভয়াবহ অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাড়িটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও অলৌকিক এবং সৌভাগ্যবশত ইমামের স্ত্রী, চার সন্তান ও এক ভাগ্নেসহ ঘরে থাকা সাতজন সদস্যের কেউই শারীরিক আঘাত পাননি। তবে এই ঘটনায় পুরো মুসলিম কমিউনিটি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তগ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশ (GMP) জানিয়েছে, ১০ জুন বুধবার রাত ৯:২০ মিনিটে বোল্টনের শার্পলস এলাকার একটি আবাসিক বাড়ি থেকে অগ্নিসংযোগের ঘটনার জরুরি কল আসে। ঘটনার পরপরই পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত সেখানে পৌঁছান।গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর মাইক শার্পলস এক বিবৃতিতে বলেন:"আমাদের সমাজে এই ধরনের কাপুরুষোচিত ও সহিংস ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কাউকে ভয়ভীতি বা হুমকির মুখে বসবাস করতে দেওয়া হবে না। সৌভাগ্যবশত এই হামলায় কেউ আহত হননি, কিন্তু এই অগ্নিসংযোগের পরিণতি কতটা ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী হতে পারত, তা সহজেই অনুমেয়।"চিফ ইন্সপেক্টর আরও জানান, পুলিশ প্রাথমিক আলামত পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হয়েছে যে এটি কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি ‘নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিকল্পিত হামলা’। তবে এই মুহূর্তে জনসাধারণের জন্য বড় কোনো হুমকি নেই বলে তারা আশ্বস্ত করেছেন। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ঘটনায় জড়িতদের সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে তা অবিলম্বে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।সিসিটিভি ফুটেজে হামলার রোমহর্ষক দৃশ্যইমাম হাসান প্যাটেল কর্তৃক প্রকাশিত বাড়ির সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজে হামলাকারীর নৃশংসতার স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। ফুটেজে দেখা যায়, কালো রঙের পোশাক পরিহিত এবং মুখ ঢাকা এক ব্যক্তি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বাড়ির দিকে এগিয়ে আসে। এরপর সে একটি কাপড়ে তরল দাহ্য পদার্থ ঢেলে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর সজোরে বাড়ির জানালার কাচ ভেঙে জ্বলন্ত বোমাটি ঘরের ভেতর ছুড়ে মারে। শুধু তাই নয়, আগুন যাতে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, সেজন্য সে জানালার ভাঙা অংশ দিয়ে আরও দাহ্য তরল স্প্রে করে, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে আগুনের শিখা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।ইমাম ও তার পরিবারের প্রতিক্রিয়াভয়াবহ এই অভিজ্ঞতার পর ইমাম হাসান প্যাটেল গভীর ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই "নৃশংস এবং নির্মম অগ্নিসংযোগের ঘটনা" তার পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এই হামলা কেবল তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করেনি, বরং তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে তার ছোট ছোট সন্তানরা এই ট্রমা থেকে বের হতে পারছে না।বোল্টন এলাকার একজন সক্রিয় ও শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে পরিচিত ইমাম হাসান প্যাটেল বলেন, তিনি সব সময় আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করেন এবং সব ধর্মের ও মতের মানুষের সাথে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। তিনি বলেন:"আমরা বুঝতে পারছি না কেন আমাদের এভাবে নিশানা করা হলো। আমাদের সাথে কারও কোনো শত্রুতা নেই। পুলিশ এখনো এটিকে সরাসরি ‘নফরত ছড়ানো অপরাধ’ বা হেট ক্রাইম হিসেবে তালিকাভুক্ত করেনি, তবে আমরা দাবি জানাই—এই হামলার পেছনে বর্ণবাদী, ইসলামভীতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তা যেন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এবং গভীরভাবে তদন্ত করা হয়।"যুক্তরাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ওপর এমন পরিকল্পিত হামলা মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত বলে মনে করছেন স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ