প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬
ভারতে জাতিসংঘের নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদেরও বাংলাদেশে পুশ-ইন করছে বিএসএফ
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF) কর্তৃক পুশ-ইনের শিকার হয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশন (UNHCR)-এর কার্ডধারী অন্তত ১২৩ জন রোহিঙ্গা গত বছরের মে মাস থেকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে আছেন। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BGB) গত এক মাসে বিএসএফের অন্তত ৪৩টি অবৈধ পুশ-ইনের চেষ্টা সফলভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে।ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (UNHCR)-এর অধীনে নিবন্ধিত হওয়া সত্ত্বেও অন্তত ১২৩ জন রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)। গত ২০২৫ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া তিন মাসের একটি সুনির্দিষ্ট সময়কালে এই পুশ-ইনের ঘটনা ঘটে, যারা বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের জনাকীর্ণ শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত রয়েছেন। ঢাকা ও কক্সবাজারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (BGB) সদর দপ্তরের সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, কেবল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই নয়, বরং ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারত থেকে ২,৩৪৪ জন মানুষকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ১২৬ জন খোদ ভারতীয় নাগরিকও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (RRRC) কার্যালয় থেকে গত বছরের ১৪ জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছিল। তবে ভারতে নিবন্ধিত এই রোহিঙ্গাদের স্বদেশে বা ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আরআরআরসি (RRRC) প্রধান মোহাম্মদ মিজানুর রহমান কওমি টাইমসকে বলেন, "আমার জানামতে, এই রোহিঙ্গারা এখনো কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিক (FDMN) ক্যাম্পগুলোতেই অবস্থান করছেন।"এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, তিনি চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই পদে যোগ দেওয়ায় বিগত সময়ে পাঠানো সেই চিঠির বিষয়ে বিস্তারিত অবগত নন।বিজিবি সূত্র নিশ্চিত করেছে, গত বছর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত যে ১২৬ জন ভারতীয় নাগরিককে পুশ-ইন করা হয়েছিল, বাংলাদেশ তাদের শনাক্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতে পুশ-ব্যাক (ফেরত) করতে সক্ষম হয়।বাংলাদেশের সুদীর্ঘ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অরক্ষিত সীমান্তের সুযোগ নিয়ে একদিকে যেমন মিয়ানমার থেকে জাতিগত ও ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে, তেমনি অন্যদিকে ভারতের পুশ-ইন ক্যাম্পেইনের শিকার অসহায় মানুষগুলোকেও ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, বিগত বছরগুলোতে মিয়ানমার থেকে আসা ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। আরআরআরসি কার্যালয় আশঙ্কা করছে, প্রকৃতপক্ষে পুশ-ইনের শিকার রোহিঙ্গার সংখ্যা নথিবদ্ধ তথ্যের চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে।এই অমানবিক পুশ-ইনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান একে 'মানবতাবিরোধী অপরাধ' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন:"জাতিগত এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করে পুশ-ইন করা স্পষ্টত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত শরণার্থীদের জোরপূর্বক অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া জেনেভা কনভেনশনেরও চরম অবমাননা।"পশ্চিমবঙ্গে উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রভাব ও মুসলিম নির্যাতনরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় এক মাস আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে উগ্র সাম্প্রদায়িক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও পুশ-ইনের চেষ্টা বহুগুণ বেড়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কোনো আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই তথাকথিত 'অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী' বিতাড়নের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি সীমান্তজুড়ে তিনি 'হোল্ডিং সেন্টার' বা ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন, যেখান থেকে সন্দেহভাজনদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করা সহজ হয়।বিজেপি গত এক দশক ধরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই পুশ-ইন নীতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালে পার্শ্ববর্তী আসাম রাজ্যে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ডজন ডজন ভারতীয় মুসলিমকে 'অবৈধ অভিবাসী' আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইন করেছিল। বাংলাদেশ তাদের গ্রহণ না করায় তারা জিরো পয়েন্ট বা 'নো-ম্যানস ল্যান্ড'-এ আটকা পড়েন। পরবর্তীতে ভারত সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে স্থানীয় ভারতীয় মুসলিমরা চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, আইনি মর্যাদার চেয়ে কেবল 'ধর্মীয় পরিচয়'-কে টার্গেট করে যেভাবে আসামে মুসলিমদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল, এবার পশ্চিমবঙ্গেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। ভারতীয় মানবাধিকার কর্মীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, প্রশাসন কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত এজেন্ডা ও রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তবায়নে অন্ধের মতো কাজ করছে। পুলিশ যাকে-তাকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করছে।সম্প্রতি শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন যে, তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর গত এক মাসে প্রায় ৫,০০০ বাংলাদেশি নাগরিককে পুশ-ইন বা বিতাড়ন করেছেন। তবে বিজিবি উগ্রপন্থী এই নেতার দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে।বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকগত ১১ জুন নতুন দিল্লিতে সমাপ্ত হওয়া ৫৭তম বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ডিগিকে স্পষ্ট ভাষায় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মানুষ পুশ-ইন করা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি যেকোনো নাগরিকের জাতীয়তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যকার প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, প্রটোকল ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের তাগিদ দেন।জবাবে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার বাংলাদেশ সরকারের কাছে ঝুলে থাকা জাতীয়তা যাচাইকরণের বিষয়গুলো দ্রুত শেষ করার এবং চিহ্নিত ব্যক্তিদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার অনুরোধ জানান। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪,১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার মধ্যে ১৮০ কিলোমিটার জলসীমা এবং ৭৯ কিলোমিটার সুন্দরবনের আওতাভুক্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ