প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার: ভারতে মুসলিম নারীদের নিশানা করে ছড়ানো হচ্ছে আপত্তিকর ডিপফেক
ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভয়াবহ মাত্রায় অনলাইন হ্যারাসমেন্ট বা যৌন নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। উগ্র ডানপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী আইডেন্টিটি ব্যবহারকারী বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে পরিকল্পিতভাবে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে আপত্তিকর ছবি, ভিডিও এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, যা ভুক্তভোগীদের বাস্তব জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ (CSOH)-এর একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা একে সংখ্যালঘু নারীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক আধিপত্য বিস্তারের এক নগ্ন হাতিয়ার এবং ‘ডিজিটাল লিঞ্চিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।ভারতে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির অপব্যবহার এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে মডেল, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের টার্গেট করে জেনারেটিভ এআই-এর মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে যৌন উত্তেজক ও মানহানিকর ভুয়া কনটেন্ট। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাইবার গ্রুপগুলো এই প্রযুক্তিকে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক মারণাস্ত্র বা 'ডিজিটাল লিঞ্চিং' হিসেবে ব্যবহার করছে।কাশ্মীরের ফ্রিল্যান্স মডেল সমরিন আইয়ুব (২৪) গত বছর ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও দেখে স্তম্ভিত হয়ে যান। ভারতের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষার্থীর সাধারণ ক্যাম্পাস জীবনের ছবিগুলো সোশ্যাল মিডিয়া থেকে চুরি করে এআই ভয়েসওভারের মাধ্যমে একটি ভুয়া নিউজ সেগমেন্ট তৈরি করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, সমরিন হিন্দু পুরুষদের কাছে "দেহ ব্যবসা" করছেন এবং ছবিতে থাকা তার নিজের আপন ভাইকে "দালাল" হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সমরিন বলেন, "ভিডিওটি এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে, আমার বাবা-মা দেখলেও এটিকে সত্য বলে ভুল করতেন। এটি ছিল সুপরিকল্পিত স্টকিং।" এই ঘটনার পর সমরিনের পেশাগত জীবন ধ্বংসের মুখে পড়ে এবং ব্র্যান্ডগুলো তার সাথে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।গবেষণায় ভয়াবহ সত্য উন্মোচনওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ (CSOH) ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত এক্স (সাবেক টুইটার), ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের প্রায় ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্টের ১,৩২৬টি এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট বিশ্লেষণ করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা এসব যৌন উত্তেজক ও আপত্তিকর কনটেন্টে ৬.৭ মিলিয়নেরও বেশি ইন্টারঅ্যাকশন বা ভিউ হয়েছে, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই অপব্যবহারের সর্বোচ্চ রেকর্ড।গবেষণার সহ-লেখক জেনিথ খান বলেন, "জেনারেটিভ এআই অত্যন্ত কম খরচে এবং চোখের পলকে যেকোনো যৌন ফ্যান্টাসিকে বাস্তবসম্মত ছবিতে রূপান্তর করতে পারে। প্রযুক্তিগত জ্ঞান ছাড়াই উগ্রপন্থীরা মুসলিম নারীদের হিজাব বা ধর্মীয় পোশাক পরিহিত অবস্থায় অত্যন্ত আপত্তিকর ও পর্নোগ্রাফিক সিনারিওতে উপস্থাপন করছে।" গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই কনটেন্টগুলোতে প্রায়শই একজন "মুসলিম কোডেড নারী" এবং একজন "হিন্দু কোডেড পুরুষ" জোড়া তৈরি করে দেখানো হয়, যেখানে মুসলিম পুরুষদের উগ্র এবং মুসলিম নারীদের হিন্দু পুরুষদের দ্বারা "উদ্ধার" বা অবদমিত হওয়ার ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়।রাজনীতির ‘পর্নোফাইড’ রূপমিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া অ্যানথ্রোপলজিস্ট সাহানা উদুপা এই প্রবণতাকে রাজনীতির ‘পর্নোফিকেশন’ বা ‘পর্নোফাইড পলিটিক্স’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। ডানপন্থী ডিজিটাল কালচার হাস্যরস, মিম এবং যৌন নিপীড়নকে একত্রিত করে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তুলছে।গবেষক সোমা বসু তাঁর এক পিয়ার-রিভিউড প্রবন্ধে লিখেছেন, এটি মূলত যৌনতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার একটি সাম্প্রদায়িক কৌশল। দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতে নারীর শরীরকে পরিবারের ‘সম্মান’ হিসেবে দেখা হয়, তাই মুসলিম নারীদের দৃশ্যত অপমান করার মাধ্যমে পুরো মুসলিম সমাজকে নিকৃষ্ট ও হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। এর আগে ২০২১ ও ২০২২ সালে ‘সুল্লি ডিলস’ (Sulli Deals) এবং ‘বুল্লি বাই’ (Bulli Bai) নামক মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে শত শত খ্যাতনামা মুসলিম নারীকে অনলাইনে ‘নিলামে’ তোলার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটেছিল, যার সাথে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির আইটি সেল ও স্বেচ্ছাসেবকদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ মদদের অভিযোগ উঠেছিল।আইনি শূন্যতা ও ভুক্তভোগীদের আতঙ্কভারতের বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তি আইন (IT Act) এআই-জেনারেটেড অপরাধ মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর অপর গুপ্ত বলেন, "ভারতের আইটি অ্যাক্টের ৬৬ই ধারা অনুযায়ী সম্মতি ছাড়া কারও ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ধারণ বা প্রকাশ করা অপরাধ। কিন্তু এআই-এর ক্ষেত্রে যেহেতু নারীর আসল শরীর ধারণ করা হয় না, তাই এই আইন কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।"২০১৯ সালে ভারতের বৈষম্যমূলক নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (CAA) বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আলোচনায় আসা মুসলিম অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা (২৭)-ও সুল্লি ডিলস অ্যাপের শিকার হয়েছিলেন। চার বছর পরও তার ওপর অনলাইন হামলা থামেনি। বেনামী হিন্দু নামধারী অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিনিয়ত তাকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আফরিন ফাতিমা বলেন, "এই এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার আমাদের মাঝে এক ধরনের সাইকোসিস বা চরম মানসিক আতঙ্ক তৈরি করেছে। এখন একা ভ্রমণ করতেও আমার ভয় লাগে। অনলাইনে মুসলিম নারীদের নিয়ে যে নোংরা ফ্যান্টাসি ছড়ানো হচ্ছে, তা যেকোনো সময় বাস্তবে আমাদের ওপর শারীরিক হামলার কারণ হতে পারে।"ভুক্তভোগী নারীরা পুলিশে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। আইনি দীর্ঘসূত্রতা, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর উদাসীনতা এবং সামাজিক লজ্জার কারণে অধিকাংশ মুসলিম নারী এই ট্রমার কথা প্রকাশ করতে পারেন না, যা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম নারীদের ডিজিটাল ও বাস্তব উভয় জীবনকেই চরম নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ