প্রকাশের তারিখ : ০৪ জুলাই ২০২৬
মুসলিম সন্দেহে হিন্দু ট্রাক চালককে হেনস্তা ট্রাফিক পুলিশের, 'গাদ্দার' আখ্যা দিয়ে সাম্প্রদায়িক প্রোফাইলিং
ভারতের মহারাষ্ট্রের ইয়াভাতমালের করঞ্জি এলাকায় এক হিন্দু ট্রাক চালককে ভুলবশত মুসলিম সাব্যস্ত করে সাম্প্রদায়িক হেনস্তা ও 'গাদ্দার' (দেশদ্রোহী) আখ্যা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবলের বিরুদ্ধে। গত ২৭ জুন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাজস্থানের জাট সম্প্রদায়ের চালক শ্যামলাল রাওকে ধর্মীয় উসকানি ও পুলিশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছেন ওই কনস্টেবল। পরবর্তীতে চালকের প্রতিবাদ এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।ভারতের বুকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা ও সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্বেষ কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছে, তার এক নগ্ন রূপ সামনে এলো মহারাষ্ট্রে। রাজ্যটির ইয়াভাতমাল জেলার করঞ্জি নামক এলাকায় কর্তব্যরত এক ট্রাফিক পুলিশ কনস্টেবল একজন হিন্দু ট্রাক চালককে ভুলবশত মুসলিম মনে করে সাম্প্রদায়িক প্রোফাইলিং ও হেনস্তা করেছেন। শুধু তাই নয়, তাকে 'গাদ্দার' বা দেশদ্রোহী হিসেবেও লেবেল করার চেষ্টা চালানো হয়।ঘটনার শিকার ট্রাক চালকের নাম শ্যামলাল রাও। তিনি মূলত রাজস্থানের বাসিন্দা এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী জাট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। ঘটনার সময় তিনি একটি ভিডিও রেকর্ড করছিলেন। শ্যামলাল জানান, সড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত কীভাবে মুসলিম চালকদের টার্গেট করে পুলিশি হয়রানি ও চাঁদাবাজি চালানো হয়, তা প্রমাণ করতেই তিনি ভিডিওটি ধারণ করছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি নিজেই সেই সাম্প্রদায়িক মানসিকতার শিকার হয়ে যান।ভাইরাল হওয়া ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যায়, ওই ট্রাফিক কনস্টেবল শ্যামলালের সহকর্মীকে ভিডিও রেকর্ডিং করতে বাধা দিচ্ছেন এবং শারীরিক বলপ্রয়োগের চেষ্টা করছেন। এ সময় চালক শ্যামলাল রাও স্বচ্ছতার স্বার্থে কনস্টেবলকে তার মুখের ঢাকনা (মাস্ক/রুমাল) সরানোর অনুরোধ জানান। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ওই পুলিশ সদস্য। চালকের সাহসিকতা ও অধিকার সচেতনতাকে সহ্য করতে না পেরে তিনি সরাসরি তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন।ভিডিওতে কনস্টেবলকে বলতে শোনা যায়, "তুমি কি মুসলিম? তুমি নিশ্চিতভাবেই মুসলিম।" জবাবে শ্যামলাল যখন বলেন তিনি রাজস্থানের জাট, তখন কনস্টেবল ক্ষিপ্ত হয়ে উগ্র ও বিদ্বেষী মন্তব্য করে বসেন। তিনি বলেন, "তুই যদি হিন্দু হতি, তবে এমন করতি না। তুই কেন গাদ্দারদের মতো কাজ করছিস? (Gaddari wala kaam kyun karra?) এখানে দাদাগিরি দেখাবি না।" অর্থাৎ, ওই পুলিশ কর্মকর্তার চোখে যেকোনো প্রতিবাদ বা অধিকারের কথা বলাই হলো 'মুসলিমদের কাজ' এবং তা 'গাদ্দারি' বা দেশদ্রোহিতার শামিল।এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই সেখানে একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত হন। শ্যামলাল রাও দমে না গিয়ে ওই সিনিয়র অফিসারের সামনেই কনস্টেবলের এই সাম্প্রদায়িক আচরণের প্রতিবাদ জানান। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমি রাজস্থানের একজন জাট। উনি আমার সাথে অত্যন্ত রুক্ষ ব্যবহার করেছেন, তাই আমি অভিযোগ জানাতে এসেছি। আর এর জবাবে উনি আমাকে বলছেন— তুই মুসলমান, হিন্দু হলে এমন করতি না! আপনিই বলুন, সরকারি পোশাকে থেকে ধর্মের কথা তোলার মানে কী?"শ্যামলাল আরও যোগ করেন, "আপনি একজন সরকারি কর্মচারী, আপনি জনগণের সাথে এমন আচরণ করতে পারেন না।" তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যতক্ষণ না ওই ট্রাফিক কনস্টেবল তার এই আচরণের জন্য ক্ষমা চাইবেন, ততক্ষণ তিনি সরবেন না। অবশেষে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং চালকের অনড় প্রতিবাদের মুখে সিনিয়র অফিসারের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সমাধান হয় এবং পুলিশ ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়।এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করলো যে, ভারতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর একটি অংশের মধ্যে মুসলিমবিদ্বেষ ও উগ্র মানসিকতা কতটা তীব্র, যেখানে যেকোনো সাধারণ নাগরিককে কেবল দাড়ি, পোশাক বা প্রতিবাদের কারণে 'মুসলিম' ও 'দেশদ্রোহী' বলে দাগিয়ে দেওয়া এক নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ