প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬
ইসলামফোবিয়ার চূড়ান্ত পরিণতিই হলো গণহত্যা — ড. সালমান সাইয়্যিদ
যুক্তরাজ্যের লিডস ইউনিভার্সিটির ডিকলোনিয়াল থট অ্যান্ড সোশ্যাল থিওরি বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. সালমান সাইয়িদ বলেছেন, ইসলামফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষ কেবল সাধারণ কোনো ব্যক্তিগত কুসংস্কারের বিষয় নয়। এটি আসলে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক প্রজেক্ট, যার চূড়ান্ত পরিণতি বা শেষ বিন্দু হলো ‘গণহত্যা’। আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের ওপর চলা পদ্ধতিগত নিপীড়ন, বর্ণবাদ এবং এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।বিশ্বজুড়ে ইসলামফোবিয়া বা মুসলিম বিদ্বেষকে সাধারণত হিজাব পরিহিত নারীদের ওপর হামলা বা কিছু বিচ্ছিন্ন বৈষম্যের ঘটনা হিসেবে হালকাভাবে দেখা হয়। কিন্তু প্রফেসর ড. সালমান সাইয়িদ মনে করেন, এই দৃষ্টিভঙ্গি আসল রাজনৈতিক ও আদর্শিক এজেন্ডাকে আড়াল করে রাখে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "মুসলিম বিদ্বেষ অতি সূক্ষ্ম আক্রমণ (মাইক্রো-অ্যাগ্রেশন) থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এর চূড়ান্ত যৌক্তিক পরিণতি হলো গণহত্যা।"প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও গভীর চক্রান্তড. সাইয়িদ জোর দিয়ে বলেন, ইসলামফোবিয়া কেবল কিছু ব্যক্তির মনের ভেতরের ঘৃণা নয়, এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিমানবন্দর বা কাস্টমসে কর্মরত কোনো মুসলিম কর্মকর্তা যখন হিজাব বা দাড়িওয়ালা কোনো যাত্রীকে অতিরিক্ত তল্লাশি বা সন্দেহের চোখে দেখেন, তখন বুঝতে হবে সেটা ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ঘৃণা নয়। বরং তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সেভাবেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা অজান্তেই একটি ইসলামবিদ্বেষী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করছেন। এর মূল লক্ষ্য হলো—মুসলিমরা যেন সমাজে নিজেদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রকাশ বা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে।গণহত্যার অকাট্য দলিলমুসলিম বিদ্বেষকে যারা ‘সামান্য অস্বস্তি’ বলে উড়িয়ে দিতে চান, তাদের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিয়ে প্রফেসর সাইয়িদ বলেন, "বসনিয়া, চেচনিয়া, পূর্ব তুর্কিস্তান (উইঘুর), কাশ্মীর এবং মিয়ানমারের আরাকানের (রোহিঙ্গা) কথা ভাবুন। এসব অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে কেবল তাদের মুসলিম পরিচয়ের কারণেই গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে।"তিনি ফিলিস্তিন ইস্যুটিকে কেবল একটি আঞ্চলিক সংকট হিসেবে দেখতে নারাজ। ড. সাইয়িদ বলেন, আজ বিশ্বজুড়ে ফিলিস্তিনের পক্ষে যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, তা মূলত উপনিবেশবাদবিরোধী এক অভিন্ন চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ফিলিস্তিন আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিরোধ ও মুক্তির বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।"বসনিয়া, চেচনিয়া, পূর্ব তুর্কিস্তান, কাশ্মীর এবং আরাকানের কথা ভাবুন। এসব অঞ্চলের মানুষকে কেবল তাদের মুসলিম পরিচয়ের কারণেই গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে।"— প্রফেসর ড. সালমান সাইয়িদসবচেয়ে বিপজ্জনক ইসলামোফোবদের কেউ কেউ খোদ মুসলিমসাক্ষাৎকারে ড. সালমান সাইয়িদ একটি তিক্ত সত্য সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, জন্মসূত্রে মুসলিম হলেই কেউ ইসলামফোবিয়ার বাইরে থাকবেন, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তিনি বলেন, "আমাদের এটি স্বীকার করতে হবে যে, সমাজে সবচেয়ে বড় ও কট্টর ইসলামোফোবদের কেউ কেউ খোদ মুসলিমদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ইসলামের রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্তৃত্ব ঠেকাতে অনেক মুসলিমই স্বৈরাচারী শাসন, সামরিক অভ্যুত্থান এবং ডিকটেটরশিপ বা একনায়কতন্ত্রকে সমর্থন দেয়। এই মানসিকতা মুসলিম সমাজগুলোতে গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।"বর্ণবাদের নতুন বৈশ্বিক ব্যাকরণড. সাইয়িদ সতর্ক করে বলেন, ইসলামফোবিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা বিক্ষিপ্ত ও দুর্বল হওয়ার কারণেই এটি আজ বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন মুসলিম দেশ বা সংস্থা যখন ইসলামফোবিয়া নিয়ে কথা বলে, তখন তারা সাধারণ সমাধান খোঁজে—যেমন ‘মানুষকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝানো’ বা ‘আন্তঃধর্মীয় সংলাপ’। কিন্তু সমস্যাটি তথ্যের অভাব বা অজ্ঞতা নয়।তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামফোবিয়াকে একটি 'আধুনিক বর্ণবাদ' (Form of Racism) হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। বর্ণবাদ কখনো কেবল অজ্ঞতা থেকে আসে না। উগ্র জাতিয়তাবাদ বা হিন্দুত্ববাদের মতো এথনো-ন্যাশনালিজম যেখানেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, সেখানেই মুসলিম বিদ্বেষ তীব্র হচ্ছে। তাই উগ্র জাতিয়তাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অর্থই হলো ইসলামফোবিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করা।তিনি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বলেন, "বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে দেশের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনের পতাকাও ওড়ানো হয়েছিল। কারণ তরুণ প্রজন্ম ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী লড়াইয়ের মাঝে বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ দেখতে পায়।"মুক্তির পথ কেবলই সুসংগঠিত হওয়াপ্রফেসর সাইয়িদ তরুণ মুসলিমদের নিজেদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এই প্রবণতাকে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিবাদ করে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। পরিবর্তন আনতে হলে সমাজ, বন্ধু মহল ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সুসংগঠিত হতে হবে।তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের পতন কিংবা তুরস্কে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান যেভাবে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে নসাৎ করে দিয়েছিল—তা হুট করে হয়নি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের বিভিন্ন স্টাডি গ্রুপ, ক্লাব এবং বিকল্প মিডিয়ার সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে যখন মানুষ সংগঠিত হয়, তখনই কেবল পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ