প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি (র.): ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ও চিন্তাবিজ্ঞানের অমর বিশ্বকোষ
সেলজুক সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে জন্ম নেওয়া মহান ফকিহ, দার্শনিক, শাস্ত্রবিদ ও আধ্যাত্মিক সাধক ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (১০৫৮–১১১১ খ্রি.) ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তুসের এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে বাগদাদের বিখ্যাত নিজামিয়া মাদরাসার প্রধান পদে অধিষ্ঠিত হওয়া এবং পরবর্তীতে সচ্ছল জীবন ত্যাগ করে ১১ বছরের আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে পুনরুজ্জীবিত করার কাহিনি আজও বিশ্বজুড়ে অনুসৃত হয়। তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বহুমুখী রচনার মধ্য দিয়ে তিনি গ্রীক দর্শনের অসারতা প্রমাণের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক সত্যের অনন্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছিলেন।ইসলামি চিন্তাধারা, ফিকহ, কালাম ও তাসাউফের ইতিহাসে যিনি 'হুজ্জাতুল ইসলাম' (ইসলামের সত্যতার প্রমাণ) এবং 'জয়নুদ্দীন' (ঈমানের সৌন্দর্য) উপাধিতে ভূষিত, সেই মহান ইমাম গাজ্জালি (র.)-এর বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক অবদান বিশ্বজুড়ে আজও আলোকবর্তিকা হয়ে রয়েছে। ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরানের তুস (তৎকালীন গাজাল) শহরের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই মহামানব মাত্র ৫৩ বছরের ক্ষণজন্মা জীবনে উম্মাহকে দান করে গেছেন জ্ঞানের এক চিরন্তন মহাসমুদ্র।প্রাথমিক শিক্ষা ও নিজামিয়া মাদরাসার দিনগুলোইমাম গাজ্জালি (র.) প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন নিজ শহর তুসে। পরবর্তীতে তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র নিশাপুরে গমন করে কালজয়ী বিশ্ববিশ্রুত আলিম ইমামুল হারামাইন আবু মাআলি আল-জুওয়ায়নীর অধীনে হাদিস, ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা ও কালাম শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর অসাধারণ মেধা ও বাকপটুতা দেখে সেলজুক সাম্রাজ্যের বিখ্যাত উজির নিজামুল মুলক তাঁকে বাগদাদে আমন্ত্রণ জানান।মাত্র ৩৪ বছর বয়সে তিনি বাগদাদের ঐতিহাসিক নিজামিয়া মাদরাসার প্রধান প্রধান শিক্ষক (মুদাররিস) নিযুক্ত হন। সেখানে তাঁর অধীনে আবু মনসুর মুহাম্মদ ও মুহাম্মদ বিন আসআদ আত-তুসির মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গসহ ৩০০ জনেরও বেশি উচ্চতর শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভ করেন। এ সময় রাজ্যপ্রধান, পণ্ডিত ও সাধারণ মানুষের নিকট তিনি অপরিসীম সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেন।গ্রীক দর্শনের অসারতা ও বিজ্ঞানের নতুন দিগন্তপশ্চিমা ও গ্রীক দার্শনিকদের বিভ্রান্তিকর মতবাদ খণ্ডনে ইমাম গাজ্জালি (র.) গ্রীক ও লাতিন ভাষা অনুবাাদের মাধ্যমে দর্শনশাস্ত্রে টানা তিন বছর গভীর গবেষণা চালান। এরপর তিনি রচনা করেন 'মাকাসিদুল ফালাসিফাহ' এবং 'তাহাফুতুল ফালাসিফাহ' (দার্শনিকদের অসঙ্গতি)। তৎকালীন ইউরোপীয় পণ্ডিতরা যখন পৃথিবীকে চ্যাপ্টা মনে করত, তখন ইমাম গাজ্জালি প্রমাণ করেন যে পৃথিবী গোলাকার।শুধু দর্শন নয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানেও তাঁর অবদান ছিল বিস্ময়কর। মানবদেহের যকৃতে রক্ত পরিশোধন, পিত্ত ও লিম্ফের কাজ এবং প্লীহা ও কিডনির জৈবিক ভূমিকা তিনি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করেন। রক্তে বিভিন্ন উপাদানের তারতম্যের কারণে যে দেহের স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হয়, তা তিনি প্রমাণ সাপেক্ষে তুলে ধরেন।একাগ্র সাধনা ও 'ইহয়াউ উলুমিদ্দীন'সাফল্যের শীর্ষে অবস্থানকালেই এক আত্মিক পরিবর্তনের মুখে তিনি বাগদাদের রাজকীয় জীবন ও পদমর্যাদা ত্যাগ করেন। নিজের স্থলাভিষিক্ত করেন ভাই আহমদ গাজ্জালিকে। তিনি পরিভ্রাজকের বেশে সিরিয়ার দামেস্ক, জেরুজালেম এবং মক্কায় যাত্রা করেন।দামেস্কের ঐতিহাসিক উমাইয়া মসজিদের পশ্চিম পাশে অবস্থিত 'জাবিয়া' বা খানকাহতে টানা ১১ বছর নির্জন বাস ও কঠোর সাধনায় নিমগ্ন থাকেন। এই আধ্যাত্মিক নির্জনবাসের ফলশ্রুতিতেই জন্ম নেয় বিশ্ববিখ্যাত আকরগ্রন্থ 'ইহয়াউ উলুমিদ্দীন' (দীনী জ্ঞানের পুনরুজ্জীবন)। এই গ্রন্থটিতে তিনি ফিকহ, আখলাক ও তাসাউফের এমন এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটান যা ইসলামি বিশ্বকে নতুন জীবনের দিশা দেয়।জীবন সায়াহ্নে রচনা ও অমর সৃষ্টিসিরিয়া ও কুদুস (জেরুজালেম) সফর শেষে তিনি পুনরায় তুসে নিজ ভিটায় ফিরে আসেন। সেখানে তিনি একটি মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে জীবনের শেষ দিনগুলো তালিম ও তাসাউফে অতিবাহিত করেন। মিশরের বিশিষ্ট গবেষক আবদুর রহমান বাদবীর গবেষণা মতে, ইমাম গাজ্জালি ৪৫৭টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে বর্তমানে ৭৫টি মূলগ্রন্থ সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য রচনার মধ্যে রয়েছে 'কিমিয়ায়ে সাআদাত', 'আল-মুঙ্কিজ মিনাদ দালাল', 'মিশকাতুল আনোয়ার', 'ইলজামুল আওয়াম আন ইলমিল কালাম' ইত্যাদি।১৯ ডিসেম্বর ১১১১ খ্রিস্টাব্দে এই মহান ইসলামি দার্শনিক ও মুজাদ্দিদ জন্মভূমি তুসেই ইন্তেকাল করেন। মানবজাতির চিন্তাজগতে এবং ইসলামি পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান কিয়ামত পর্যন্ত অম্লান হয়ে থাকবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ