প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
মনোহরদীতে সততা ও স্বচ্ছতার অনন্য নজির: খাল খনন শেষে সাশ্রয়কৃত ৪৭ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে সততা, স্বচ্ছতা ও নিখুঁত অর্থ ব্যবস্থাপনার এক অনন্য ও বিরল নজির স্থাপিত হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় মহিষাখালী ও গঙ্গাজলী খাল পুনঃখনন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে সফলভাবে সম্পন্ন করার পর প্রাক্কলিত ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ—৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯৬ টাকা সাশ্রয় করে সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে মনোহরদী উপজেলা প্রশাসন। সরকারি অর্থের অপচয় ও দুর্নীতির বিপরীতে উপজেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগ দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে।নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় দুটি ঐতিহ্যবাহী খাল পুনঃখনন প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে সাশ্রয় হওয়া ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে এক সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে উপজেলা প্রশাসন। সাধারণত সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ হরহামেশাই দেখা যায়, সেখানে সরকারি বিধি অনুসরণ করে বিশাল অঙ্কের বেঁচে যাওয়া অর্থ ফেরত দেওয়ার এ উদ্যোগ স্থানীয় জনগণ ও সচেতন মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মনোহরদী উপজেলার মহিষাখালী ও গঙ্গাজলী খাল পুনঃখনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় মহিষাখালী খালের ১ দশমিক ৬২০ কিলোমিটার এবং গঙ্গাজলী খালের ২ দশমিক ১০০ কিলোমিটারসহ মোট ৩ দশমিক ৭২০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে।প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মোট ৯৫ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩ টাকা বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছিল। তবে কাজের গুণগত মান ও নির্ধারিত মানদণ্ড শতভাগ বজায় রেখে অত্যন্ত সুসংহতভাবে কাজ শেষ করায় প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক কম ব্যয় হয়। ফলে বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক অর্থ অর্থাৎ ৪৭ লাখ ৬৫ হাজার ৯৯৬ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হয়। সরকারি নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে এই সাশ্রয়কৃত অর্থ সরকারি ব্যাংকিং চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।উপজেলা প্রশাসন জানায়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও পরামর্শে মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম এ মুহাইমিন আল জিহান প্রকল্পটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বাস্তবায়ন করেন। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নিবিড় তদারকি এবং আধুনিক ডিজিটাল সার্ভের মাধ্যমে কাজের নিখুঁত পরিমাপ নিশ্চিত করা হয়েছিল। ফলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, ভুয়া শ্রমিকের ভাউচার কিংবা কোনো প্রকার আর্থিক অপচয় ও অনিয়ম সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব হয়েছে।স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ভরাট হয়ে থাকা এই খাল দুটি পুনঃখননের ফলে এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসন হবে, সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষি উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। খননকালে উঠে আসা মাটি দিয়ে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো সংস্কার করা হয়েছে এবং পরিবেশ রক্ষায় খালের দুই পাড়ে ফলজ ও বনজ বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে।এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “সরকারি কাজ শেষ করে অবশিষ্ট টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে অত্যন্ত বিরল। মনোহরদী উপজেলা প্রশাসনের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা ও আমানতদারি থাকলে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার সম্ভব। এতে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরে আসবে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরের জন্য এটি একটি অনুকরণীয় বার্তা হয়ে থাকবে।”মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম এ মুহাইমিন আল জিহান জানান, “মনোহরদীর ঐতিহ্যবাহী মহিষাখালী ও গঙ্গাজলী খাল দীর্ঘদিন ধরে পলি পড়ে ভরাট হয়ে প্রায় অকেজো অবস্থায় পড়ে ছিল। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের উদ্যোগে খাল দুটি পুনঃখনন করা হয়। কাজ শুরুর পূর্বে এবং শেষ করার পর ডিজিটাল সার্ভের মাধ্যমে সূক্ষ্ম পরিমাপ নিশ্চিত করা হয় এবং পুরো প্রকল্প জুড়ে কঠোর নজরদারি ছিল। ফলে কোনো প্রকার অপচয় ছাড়াই শতভাগ মানসম্মত কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে। আমানতদারিতা রক্ষা করা আমাদের ধর্মীয় ও দাপ্তরিক দায়িত্ব। সরকারি অর্থের অপচয় রোধ ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাশ্রয় হওয়া পুরো অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।”
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ