প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
এক মসজিদে ৫৬ বছরের সেবা: সম্মান ও ভালোবাসায় ইমাম হাফেজ আব্দুল কদ্দুসকে ওমরাহে পাঠালেন গ্রামবাসী
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দারিয়াকান্দা গ্রামে দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে একই মসজিদে নিষ্ঠার সঙ্গে ইমামতি ও ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা দিয়ে আসা হাফেজ আব্দুল কদ্দুসকে পবিত্র ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। ১৯৭১ সাল থেকে মজিদ মণ্ডল বাড়ির জামে মসজিদে খেদমত করে আসা এই প্রবীণ আলেম পুরো গ্রামের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। বুধবার (৫ আগস্ট) গ্রামবাসী, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিতিতে এক আবেগঘন পরিবেশে তাকে সৌদি আরবের উদ্দেশে বিদায় জানানো হয়।অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে এক স্থানে স্থির থেকে সুন্নাহর খেদমত, শিশুদের কোরআন শিক্ষা প্রদান, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং ইসলামী মূল্যবোধ চর্চায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন প্রবীণ আলেম হাফেজ আব্দুল কদ্দুস। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার দারিয়াকান্দা গ্রামের মজিদ মণ্ডল বাড়ির জামে মসজিদে তার এই পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে, দেশের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ক্ষণে।দীর্ঘ ৫৬ বছরের এই সুদীর্ঘ পথচলায় তিনি কেবল একজন ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেননি; বরং পুরো গ্রামের মানুষের দ্বীনি রাহবার বা ধর্মীয় অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন। দ্বীনের প্রতি তার এই নিরবচ্ছিন্ন নিষ্ঠা, ত্যাগ ও বিনম্র সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ স্থানীয় এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে ভালোবাসার উপহার হিসেবে তাকে পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে পাঠিয়েছেন।বুধবার মসজিদ প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনায় এক আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা এ কে এম ফজলুল হক স্মৃতিচারণ করে বলেন, তরুণ বয়সে ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে হাফেজ আব্দুল কদ্দুস অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ এই সময়ে তিনি শুধু নিয়মিত সালাত পরিচালনাই করেননি; গ্রামের শিশু-কিশোরদের কোরআন শিক্ষা, সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী মূল্যবোধ চর্চা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংকটে সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলেও হাফেজ আব্দুল কদ্দুস কখনো দায়িত্ব পালনে শিথিলতা দেখাননি। তার অগাধ দ্বীনি ইলম, নম্র আচরণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে এলাকার সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।ইমামকে ওমরাহে পাঠানোর অন্যতম সংগঠক ফরিদ আহমেদ লালু ও আশরাফুল ইসলাম জানান, ৫৬ বছর ধরে পুরো গ্রামকে দ্বীনের আলোয় আলোকিত রাখার উপহার হিসেবে এলাকাবাসীর যৌথ অর্থায়ন ও উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ দান নয়, বরং একজন আলেমে দ্বীনের প্রতি এলাকাবাসীর শ্রদ্ধা ও মহব্বতের গভীর প্রকাশ।বিদায়লগ্নে চোখের জলে আবেগাপ্লুত হাফেজ আব্দুল কদ্দুস এলাকাবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন,"আমি ১৯৭১ সাল থেকে এই মসজিদে ইমামতি করছি। কখনো কল্পনাও করিনি আপনারা আমাকে এভাবে সম্মানিত করবেন। আল্লাহ আপনাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন। পবিত্র ভূমিতে গিয়ে দেশ, জাতি ও আপনাদের সবার জন্য বিশেষ দোয়া করব।"ইসলামী সমাজব্যবস্থায় একজন আলেম ও ইমামের মর্যাদা কতখানি উচ্চে, ময়মনসিংহের দারিয়াকান্দা গ্রামের এই ঘটনা তা নতুন করে প্রমাণ করল। উম্মাহর ঐক্য ও আলেমে দ্বীনের প্রতি সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসা বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ