প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
ভারতে গাভী পাচারের ভুয়া অভিযোগে দুই হিন্দু নারীকে প্রকাশ্য পিটুনি দিল উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা
ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে এক অন্তঃসত্ত্বা পোষা গাভী বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর হাতে দুই নারী চরম শারীরিক নির্যাতন ও প্রকাশ্যে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। গত সোমবার (৩ আগস্ট) গাজিয়াবাদের মোদীনগর এলাকায় হিন্দু রক্ষা দলের কর্মীদের দ্বারা পরিচালিত একটি দল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ওই মা ও মেয়েকে ‘মুসলিম’ এবং ‘গাভী পাচারকারী’ আখ্যা দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক জনক্ষোভের মুখে পুলিশ একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে।ভারতে তথাকথিত 'গো-রক্ষা' এবং গাভী পাচারের অহেতুক অভিযোগ তুলে সাধারণ মানুষের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর বেআইনি সহিংসতা ও হিংস্র নজরদারি চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলার মোদীনগর থানা এলাকায় ঘটা এক বিভৎস ঘটনা এই হিংসাত্মক পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা আবারও উন্মোচিত করেছে।প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নন্দ নগরীর বাসিন্দা সুমান ও তার মেয়ে দীপা তাদের একটি হারিয়ে যাওয়া অন্তঃসত্ত্বা পোষা গাভী উদ্ধার করে মুরাদ নগরের বাড়ির দিকে হেঁটে নিয়ে যাচ্ছিলেন। বাহন ভাড়া করার মতো আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় তারা হেঁটে গন্তব্যে রওনা হন। পথিমধ্যে 'হিন্দু রক্ষা দল'-এর সভানেত্রী স্বপ্ন আগরওয়ালের নেতৃত্বে একদল উগ্রপন্থী তাদের গতিরোধ করে। তারা দাবি করে, গাভীটিকে জবাই করার উদ্দেশ্যে পাচার করা হচ্ছিল।ভুক্তভোগী দীপা জানান, তারা বারবার উগ্র দলটিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তারা হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং গরুটি তাদের নিজেদের পোষা প্রাণী। কোনো অবস্থাতেই এটি পাচার বা জবাইয়ের জন্য নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি যেকোনো সন্দেহে নিকটস্থ থানায় গিয়ে সত্যতা যাচাই করার জন্য অনুনয়-বিনয় করেন তারা। কিন্তু কোনো যুক্তিতেই কর্ণপাত করেনি হিন্দুত্ববাদী গো-রক্ষকরা।অভিযোগ উঠেছে, ভুক্তভোগীদের কথা না শুনেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দলটি। তাদের গালাগালি করা হয়, 'মুসলিম' বলে আখ্যা দেওয়া হয় এবং জনসমক্ষে জুতো ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর ও হীন অপমান করা হয়। উক্ত ঘটনায় রেণু নামের আরও এক নারী চরমভাবে লাঞ্ছিত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, নারীরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আকুতি জানালেও কোনো বাধা ছাড়াই তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এই ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার নীরবতা এবং গো-রক্ষার নামে উগ্র গোষ্ঠীর অপতৎপরতা নিয়ে দেশ-বিদেশে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।ঘটনার পর ভুক্তভোগী নারীরা থানায় হাজির হয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন। গাজিয়াবাদ পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একটি প্রথম তথ্য বিবরণী বা এফআইআর (FIR) নথিভুক্ত করেছে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত চলছে এবং তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রতিবেদনটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত অভিযুক্তদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানায়নি পুলিশ।ভারতে দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু বিশেষ করে মুসলিমদের ওপর গাভী পাচারের ভুয়া অজুহাতে গণপিটুনি ও সহিংসতা চালানো একটি নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মূলতঃ উগ্র হিন্দুত্ববাদী আদর্শে লালিত গোষ্ঠীগুলো আইনশৃঙ্খলা নিজের হাতে তুলে নিয়ে চরম ভয় ও বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে সাধারণ অমুসলিম নাগরিকরাও রেহাই পাচ্ছেন না। আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে জনসমক্ষে বিচার করার এই বিপজ্জনক প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ