প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
ইসলাম গ্রহণের অপরাধে ৫ বছর বন্দী রাখা দুই নারীকে মুক্তির নির্দেশ এলাহাবাদ হাইকোর্টের; বাবা ও যোগী সরকারকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা
ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর বিগত প্রায় ৫ বছর ধরে নিজ পরিবার কর্তৃক অবৈধভাবে গৃহবন্দী থাকা দুই প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারীকে অবিলম্বে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার খর্ব করে বেআইনিভাবে তাদের বন্দী রাখার অপরাধে ভুক্তভোগী নারীদের বাবা এবং উত্তর প্রদেশ (ইউপি) রাজ্য সরকারকে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি সন্দ্বীপ জৈনের একক বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার মাধ্যমে নারীদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশকে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দেন।ভারতের উত্তর প্রদেশে স্বেচ্ছায় সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করা দুই প্রাপ্তবয়স্ক বোনকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে অবৈধভাবে বন্দী করে রাখার অভিযোগে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীর মৌলিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা যায় না।বিচারপতি সন্দ্বীপ জৈনের একক বেঞ্চ বন্দীদের মুক্তির নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ভুক্তভোগী দুই নারীকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে যৌথভাবে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করতে তাদের বাবা এবং যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন উত্তর প্রদেশ সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে পুলিশ প্রশাসনকে ওই নারীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ব্যক্তিগত নির্বাচনে বাধা না দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।হেবিয়াস করপাস পিটিশনের শুনানি চলাকালে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, এই দুই নারী দীর্ঘ দিন ধরে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবরুদ্ধ ছিলেন। গত ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত শুনানিতে হাইকোর্ট উভয় নারীকে সশরীরে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে সময় আদালত মন্তব্য করেছিলেন, "প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ এবং পছন্দের মানুষকে বিয়ে করা ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। কোনো প্রকার জোরজবরদস্তি বা প্রতারণা না থাকলে তাদের বাবাও এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না।"ভুক্তভোগী নারীদের পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ কাইফ হাসান ও আইনজীবী কুনওয়ার সুলতান আলী সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই রায় প্রমাণ করে যে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাধীনতা তার পরিবারের ধর্মীয় বা সামাজিক পছন্দের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আইনজীবী সৈয়দ কাইফ হাসান বলেন, "আদালতের এই হস্তক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওই নারীরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। আদালত পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নারীদের স্বাধীন জীবনযাপনে কোনো বাধা না সৃষ্টি করে।"আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ভারতীয় সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে প্রদত্ত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার এবং স্বীয় পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম চর্চার স্বাধীনতাকে পুনরায় সুরক্ষিত করল। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের মে মাসে দুই বোন স্বইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে নিজেদের পছন্দের মুসলিম জীবনসঙ্গীকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলে তাদের বাবা অনিল কুমার ভাটিয়া আগ্রার সদর বাজার থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) অধীনে মিথ্যা মামলা দায়ের করেন এবং স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় মেয়েদের বন্দী করে রাখেন।শুনানিতে আবেদনকারীদের আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে, এই রূপান্তর সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় সংঘটিত হয়েছে এবং এতে কোনো প্রলোভন, বলপ্রয়োগ বা প্রতারণা ছিল না। ফলে উত্তর প্রদেশের বিতর্কিত ‘ধর্মান্তর বিরোধী আইন, ২০২১’ এই ক্ষেত্রে কোনোভাবেই প্রযোজ্য নয়। আদালত সম্পূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করে স্পষ্ট রায় দেন যে, পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের নিজস্ব বিশ্বাস ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার ক্ষুণ্ন করার এখতিয়ার রাষ্ট্র বা পরিবারের নেই।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ