প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
ভারতের ১০৩ বছরের ঐতিহাসিক মসজিদে শেষরাতে পুলিশের তল্লাশি, আতঙ্কে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের ঐতিহাসিক মুসলিম অধ্যুষিত শহর মালেগাঁওয়ে গভীর রাতে একটি শতাব্দীর প্রাচীন মসজিদ ও সংলগ্ন বাসাবাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে পুলিশের একাধিক বিশেষ দল। ১৩ আগস্ট রাত আনুমানিক ২টা থেকে ৩টার মধ্যে মালেগাঁওয়ের ইসলামপুরা ওয়ার্ডের বারকাতপুরা এলাকায় অবস্থিত ‘মসজিদ আহলে সুন্নাত খানকাহ বারকাতিয়া নকশাবান্দিয়া’-তে এ অভিযান পরিচালিত হয়। স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি নাসিক ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াডের (ATS) সদস্যরা এই যৌথ অভিযানে অংশ নেন।হঠাৎ গভীর রাতে বিশাল পুলিশ বহর নিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এমন তল্লাশিতে হতচকিত হয়ে পড়েন এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের মতে, মালেগাঁওয়ের ইতিহাসে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদে পুলিশি তল্লাশির এমন ঘটনা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।অভিযানের বিষয়ে পুলিশ এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্পষ্ট বা লিখিত ব্যাখ্যা প্রদান করেনি। তবে মুখে তারা এটিকে স্বাধীনতা দিবসের আগে একটি ‘নিয়মিত মহড়া ও পর্যবেক্ষণ’ বলে দাবি করেছে।অভিযান চলাকালে উপস্থিত থাকা মুসল্লি জামিল আহমেদ আবদুল গাফফার জানান, গভীর রাতে পুলিশের কয়েকটি টিম মসজিদে প্রবেশ করে। তারা স্থানটি অনুসন্ধানের সময় স্থানীয় প্রতিনিধি ও তরুণদের উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানায়। পুলিশ সদস্যরা জুতো খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং স্থানীয় মুসলিম যুবকদের সহায়তায় মসজিদের বিভিন্ন অংশ খতিয়ে দেখেন। এ সময় তারা মসজিদের বিভিন্ন দেওয়াল ও স্থানে টোকা দিয়ে পরীক্ষা চালান।জামিল আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই তল্লাশিতে মসজিদ বা আশেপাশের কোনো বাড়ি থেকে কোনো ধরনের সন্দেহজনক, আপত্তিকর বা ক্ষতিকর বস্তু উদ্ধার হয়নি। অহেতুক এমন পদক্ষেপে সাধারণ মানুষ চরম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন।”পরবর্তীতে বারকাতপুরা এলাকার একটি প্রতিনিধি দল ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (DSP) সিদ্ধার্থ ব্রাওয়ালের সাথে দেখা করে এই বিষয়ে আলোচনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।উলেখ্য, 'মসজিদ আহলে সুন্নাত খানকাহ বারকাতিয়া নকশাবান্দিয়া' মালেগাঁওয়ের প্রথম খানকাহ হিসেবে পরিচিত, যা ১৯২৩ সালে (১০৩ বছর আগে) প্রখ্যাত সুফি সাধক মাওলানা সৈয়দ আবু মোহাম্মদ বারকাত আলী শাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শহরজুড়ে বিস্তৃত মুসলিম সমাজের সাথে এই প্রতিষ্ঠানের এক গভীর ধর্মীয় ও আবেগঘন সম্পর্ক রয়েছে।খবর পেয়ে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (AIMIM) স্থানীয় বিধায়ক (MLA) মুফতি মোহাম্মদ ইসমাইল কাসমি খানকাহ বারকাতিয়ায় ছুটে যান। তিনি স্থানীয় মুসল্লিদের সাথে কথা বলেন এবং পরে ডিএসপি সিদ্ধার্থ ব্রাওয়ালের কাছে ঘটনার সঠিক ব্যাখ্যা দাবি করেন।মুফতি ইসমাইল কাসমি জানান, ডিএসপি তাকে জানিয়েছেন যে মহাপরিচালক (DGP) দপ্তরে জমা পড়া একটি অভিযোগের ভিত্তিতে নাসিক ক্রাইম ব্রাঞ্চের টিম মালেগাঁওয়ে আসে এবং স্থানীয় পুলিশের সহায়তা নেয়। তিনি আরও জানান, তল্লাশিকালে পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন; তারা পবিত্র কুরআনের কোনো কপির গায়ে হাত দেননি এবং স্থানীয় তরুণদের উপস্থিতিতেই তল্লাশি চালিয়েছেন।তবে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন এই আইনপ্রণেতা। তিনি প্রশ্ন করেন, “পুলিশ আসলে কী খুঁজছিল? তারা সরাসরি স্থানীয় প্রশাসন বা আমাদের কাছে স্পষ্ট কিছু বলছে না কেন? ডিরেক্টর জেনারেল অব পুলিশের কাছে কী এমন তথ্য ছিল যার ওপর ভিত্তি করে শতবছরের পুরনো একটি সুফি সংস্থায় এভাবে গভীর রাতে অভিযান চালাতে হলো?”অভিযানে সহায়তাকারী স্থানীয় যুবকরাও নিশ্চিত করেছেন যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তল্লাশির পরও পুলিশ খালি হাতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। তল্লাশি শেষ হলেও পুলিশ প্রশাসনের এই রহস্যজনক নীরবতা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তাহীনতাকে আবারও বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ