প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
ইউরোপের জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিস্থাপনকারী মুসলিম বিজ্ঞানী আল-জারকালির বিস্মৃত ইতিহাস
মুসলিম স্পেনের ঐতিহাসিক কেন্দ্র তোলেদোতে একাদশ শতকে বিজ্ঞানচর্চার এক নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছিল। বিশিষ্ট মুসলিম জ্যোতির্বিদ আবু ইসহাক আল-জারকালি তাঁর দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক যন্ত্র উদ্ভাবনের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। পরবর্তীতে তাঁর এই গবেষণা ও উদ্ভাবন লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপের বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি তৈরি করে, যা বিখ্যাত বিজ্ঞানী কোপার্নিকাসের কাজকেও প্রভাবিত করেছিল।জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অসামান্য। তাঁদেরই অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র একাদশ শতকের আন্দালুসীয় (মুসলিম স্পেন) জ্যোতির্বিদ আবু ইসহাক আল-জারকালি। তাঁর নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ও মৌলিক উদ্ভাবন পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশে গভীর ও দূরগামী প্রভাব ফেলেছিল।আল-জারকালির বৈজ্ঞানিক জীবনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল স্পেনের ঐতিহাসিক শহর তোলেদো। মুসলিম শাসনামলে এই শহরটি ছিল বিশ্বজুড়ে জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। তোলেদোতে একদল বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ দীর্ঘ সময় ধরে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। এই গবেষণা দলের মূল কাণ্ডারি ও জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন আল-জারকালি।বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে সূর্য এবং ৩৭ বছর ধরে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর এই দীর্ঘদিনের সূক্ষ্ম গবেষণার ভিত্তিতে তিনি গ্রীক ও পূর্ববর্তী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অনেক প্রচলিত হিসাবের ভুলত্রুটি চিহ্নিত করেন এবং সেগুলোর সংশোধন উপস্থাপন করেন।আল-জারকালির বিশেষত্ব কেবল নিছক পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রযুক্তিগত বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নির্মাণেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর। তিনি এমন একটি বিশেষ নক্ষত্রমণ্ডল নির্ণায়ক অ্যাস্ট্রোল্যাব যন্ত্র তৈরি করেন, যা পৃথিবীর যেকোনো অক্ষাংশে সমানভাবে ব্যবহার করা যেত। ‘আল-সাফিহা আল-জারকালিয়্যা’ নামে পরিচিত এই বহুমুখী যন্ত্রটি পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় বিজ্ঞানে ‘সাফিয়া’ বা ‘আজাফিয়া’ নামে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।এছাড়াও তিনি গ্রহের অবস্থান ও গতিবিধি নির্ভুলভাবে নির্ণয়ের জন্য ‘ইকুয়েটোরিয়াম’ নামক একটি বিশেষ যান্ত্রিক গণক তৈরি করেন। এর সাহায্যে গ্রহের জটিল গাণিতিক অবস্থান নির্ণয়ের কাজটি জ্যোতির্বিদদের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়।তাঁর এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ ও নিখুঁত হিসাবের ভিত্তিতেই তৈরি হয় সুবিখ্যাত ‘তোলেদো সারণি’ (Toledo Tables)। নক্ষত্র ও গ্রহের সঠিক অবস্থান এবং গতিবিধি সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে ইউরোপজুড়ে দীর্ঘ সময় এই সারণি ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে আল-জারকালির এই বৈজ্ঞানিক সাহিত্য ও গবেষণা আরবি থেকে লাতিনসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়। অনুবাদের সাথে সাথেই ইউরোপে তাঁর নাম পরিবর্তিত হয়ে দাঁড়ায় ‘আরজাকেল’ (Arzachel)।কয়েক শতক পর বিশিষ্ট আধুনিক জ্যোতির্বিদ নিকোলাস কোপার্নিকাস তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য রেভল্যুশনস অব দ্য হেভেনলি স্ফিয়ার্স’-এ শ্রদ্ধাভরে আল-জারকালির লাতিন নাম উল্লেখ করেন। কোপার্নিকাস সরাসরি আল-জারকালির কাছ থেকে সূর্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ধারণা না পেলেও, আল-জারকালির পর্যবেক্ষণ, সুনির্দিষ্ট পরিমাপ ও উদ্ভাবিত গাণিতিক পদ্ধতি ইউরোপীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরবর্তী বিকাশে অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।সময়ের বিবর্তনে আধুনিক বিশ্বে আল-জারকালির নাম অনেকটাই বিস্মৃত হয়েছে, কিন্তু তাঁর বৈজ্ঞানিক অবদান হারিয়ে যায়নি। ইসলামি সভ্যতার স্বর্ণযুগে মুসলিম মনীষীদের এই অবদান প্রমাণ করে যে জ্ঞান কোনো বিশেষ সংস্কৃতি বা ভূগোলের সীমানায় বন্দী নয়। তোলেদোর আকাশে নক্ষত্রের গতিপথ মাপা সেই মুসলিম বিজ্ঞানীর অবদান আজও ইউরোপের বিজ্ঞান ইতিহাসের এক অমলিন অধ্যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ