প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
গাজায় প্রতি রাতে ৩০-৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান ইসরায়েলি নিরাপত্তামন্ত্রী বেন-গভীরের
গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হত্যার অভিযান চালানো উচিত বলে মন্তব্য করেছেন দখলদার ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর। গত ১৬ আগস্ট প্রকাশ্যে আসা এক পডকাস্টে সাবেক ইসরায়েলি বন্দি রোম ব্রাসলাভস্কির সাথে আলাপকালে তিনি এ উসকানিমূলক বক্তব্য দেন। শুধু তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা ব্যক্তি নয়, বরং সাধারণ ফিলিস্তিনিদের ওপরও হামলা চালানোর পক্ষে সাফাই গান উগ্র ডানপন্থী এই মন্ত্রী।ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন করে পরিকল্পিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের আহ্বান জানিয়েছেন জিয়নিস্ট ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর। গত রোববার (১৬ আগস্ট) প্রচারিত একটি পডকাস্টে সাবেক ইসরায়েলি বন্দি রোম ব্রাসলাভস্কির সাথে আলোচনার সময় তিনি এই বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যা পরবর্তীতে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।আলোচনায় বেন-গভীর বলেন, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর উচিত প্রতি রাতে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন ফিলিস্তিনিকে বেছে বেছে হত্যা করা। এ সময় তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই হামলা কেবল যারা তৎকালীন মুহূর্তে সরাসরি হুমকি তৈরি করছে তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বর্ণবাদী ও উগ্র দৃষ্টিভঙ্গি ব্যক্ত করে তিনি আরও দাবি করেন, গাজায় এমন অনেক মানুষ রয়েছে যারা তার মতে ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নয়’ এবং তারা ‘মানুষ পদের মধ্যেই পড়ে না’।প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গাজায় সামরিক হামলা কমিয়ে আনার বা যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কড়া বিরোধিতা করেন বেন-গভীর। তিনি গাজায় আবারও ব্যাপক মাত্রায় লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড (targeted killings) শুরুর তাগিদ দেন। যদিও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে সরাসরি যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক একচ্ছত্র ক্ষমতা বেন-গভীরের হাতে নেই, তবুও নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার একজন প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে দেশটির যুদ্ধনীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এছাড়া ইসরায়েলের পুলিশ বিভাগ ও সামরিক কারাগার পরিচালনার প্রত্যক্ষ দায়িত্বও তার ওপর ন্যস্ত।পডকাস্ট চলাকালে ইসরায়েলে সম্প্রতি কার্যকর করা সামরিক আদালতের বিতর্কিত মৃত্যুদণ্ড আইন নিয়েও কথা হয়। উক্ত আইনে ইসরায়েলিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলায় অভিযুক্ত ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এ সময় সাবেক বন্দি ব্রাসলাভস্কি বেন-গভীরকে অনুরোধ করেন, কোনো ফিলিস্তিনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সময় যেন তাকে নিজ হাতে তা বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়। জবাবে বেন-গভীর তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, এই সুযোগ করে দিতে তিনি ‘দুনিয়া উল্টে দেবেন’ এবং প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবেন।ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূখণ্ড থেকে স্থায়ীভাবে বিতাড়নের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বেন-গভীর বলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে চলে যেতে বাধ্য করা বা উৎসাহিত করা উচিত। একই সাথে তিনি পুরো গাজা উপত্যকায় নতুন করে বেআইনি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন, ‘পুরো গাজাই আমাদের’।আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, কোনো অঞ্চল থেকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিত ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা বা বিতাড়ন করা আন্তর্জাতিক আইনে জাতিগত নিধন (Ethnic Cleansing) ও যুদ্ধাপরাধের শামিল।বেন-গভীরের এই বক্তব্যকে তার দীর্ঘদিনের চরমপন্থী রাজনৈতিক ধারারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কৈশোরে তিনি বর্ণবাদী কাহানিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন, যা পরবর্তীতে নিষিদ্ধ হয়। মন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও কঠোর শাস্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার এসব মানবতাবিরোধী বক্তব্যের কারণে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ তার ওপর নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও তার উগ্র অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে ইসরায়েলি সরকারের ভেতরের উগ্র ডানপন্থী জোট গাজায় পুনর্দখল ও পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের জন্য সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ