প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
শরীয়তপুরে ২৫ বছরের ভালোবাসার রাজকীয় স্বীকৃতি: ঘোড়ার গাড়িতে ইমামকে বিদায়
দীর্ঘ ২৫ বছর একই মসজিদে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে ইমামতির দায়িত্ব পালনের পর এক অনন্য ও আবেগঘন পরিবেশে বিদায় জানানো হয়েছে মাওলানা আবুল হোসেনকে। প্রিয় ইমামের প্রতি গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশে স্থানীয় মুসল্লিরা তাকে সাজানো ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে রাজকীয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে বিদায় দেন। শুক্রবার (২১ আগস্ট) শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর ইউনিয়নের নয়ান মাদবর কান্দি খানবাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে এই ব্যতিক্রমি ও স্মরণীয় বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।দীর্ঘ দ্বীনি খেদমত ও সামাজিক ভূমিকা
মাওলানা আবুল হোসেন টানা ২৫ বছর নয়ান মাদবর কান্দি খানবাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ এই সময়ে তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার খুতবা ও নামাজ, পবিত্র রমজানে তারাবিহ পরিচালনা সহ যাবতীয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নেতৃত্ব দিয়ে পরিচালনা করেন। ধর্মীয় আচারের বাইরেও তিনি স্থানীয় মুসলিম সমাজকে সহীহ দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক সংস্কার এবং নানাবিধ সামাজিক ও পারিবারিক সংকট নিরসনে পথপ্রদর্শক হিসেবে সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরম পরামর্শ প্রদান করে আসছিলেন।হৃদয়স্পর্শী বিদায় মুহূর্ত
সুদীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই স্থানে দায়িত্ব পালনের সুবাদে স্থানীয় মুসল্লি, তরুণ সমাজ ও সর্বস্তরের এলাকাবাসীর সাথে তার পরম আত্মিক ও পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে কর্মজীবনের ইতি টানার মুহূর্তটিকে স্মরণীয় ও সম্মানিত করে রাখতে স্থানীয় তরুণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেন।শুক্রবার জুমার সালাত আদায়ের পর মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, নিয়মিত মুসল্লি ও গ্রামের ধর্মপ্রাণ মানুষ একত্রিত হয়ে এক আবেগঘন পরিবেশে মাওলানা আবুল হোসেনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবর্ধনা ও বিদায় জানান। এ সময় উপস্থিত বহু মুসল্লি অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে সম্মানিত এই আলেমকে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে আরোহণ করানো হয়। রাজকীয় এই শোভাযাত্রা দেখতে এবং বিদায়ী ইমামকে এক নজর শুভেচ্ছা জানাতে পুরো সড়ক জুড়ে উৎসুক জনতার ঢল নামে।বিদায়ী ইমাম ও স্থানীয় অধিবাসীদের অনুভূতি
বিদায়বেলায় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মাওলানা আবুল হোসেন বলেন, "এই মসজিদের সাথে আমার জীবনের মূল্যবান ২৫টি বছর জড়িয়ে আছে। এখানকার প্রতিটি মুসল্লি ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে আমি সবসময় অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি। আজ বিদায়ের মুহূর্তে তারা আমাকে যেভাবে সম্মানিত করলেন, তা আমার বাকি জীবনের জন্য এক অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমি সবার নিকট দোয়ার দরখাস্ত করছি এবং সমগ্র উম্মাহ ও স্থানীয় সকলের সার্বিক কল্যাণ কামনা করছি।"স্থানীয় ইউপি সদস্য কালাম খান নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, "হুজুর আমাদের কাছে কেবল একজন বেতনভুক্ত ইমাম ছিলেন না; তিনি ছিলেন আমাদের পুরো সমাজের অভিভাবকতুল্য। দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি চরম নিষ্ঠা ও আমানতদারিতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সাথে আমাদের এই দ্বীনি ও আত্মিক বন্ধন কোনোদিন মোছার নয়।"আয়োজকদের পক্ষে রবিউল ইসলাম রাব্বি জানান, "হুজুর আমাদের দীর্ঘদিনের মুরুব্বি। ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি সুখে-দুঃখে তিনি সর্বাগ্রে পাশে থেকেছেন। তাই আমাদের সুপ্রিয় হুজুরকে সর্বোচ্চ সম্মানিত উপায়ে বিদায় জানাতেই এই ঘোড়ার গাড়ির রাজকীয় আয়োজন করা হয়েছিল। মুহূর্তটি যেমন আনন্দের, তেমনি পরম কষ্টের।"ইসলামী সমাজে ইমামের মর্যাদা
আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে, শরীয়তপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে একজন যোগ্য ও সৎ ইমাম কীভাবে সমাজ সংস্কারক ও প্রিয় অভিভাবকে পরিণত হতে পারেন। ইসলামী সমাজে আলেম ও মসজিদের ইমামদের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের এই গভীর ভালোবাসা ও মর্যাদা প্রদর্শন মুসলিম উম্মাহর সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ