প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬
এমপি-পুত্রের বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ গেল তরুণীর, অধরা প্রভাবশালী অভিযুক্ত
ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যের বেপরোয়া গাড়ি চালনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এক তরুণী। নিহত ভারতী মুখি ইনঅরবিট মলের একটি পোশাকের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। গত ১৬ আগস্ট কর্মস্থলের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় অন্ধ্রপ্রদেশের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও রাজ্যসভার এমপি লিঙ্গামানেনি রমেশের ছেলে সঞ্জুশের দ্রুতগতির গাড়ি তাকে পিষে দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনার এক সপ্তাহ পার হতে চললেও অভিযুক্ত ভিআইপিপুত্রকে পুলিশ গ্রেপ্তার না করায় নাগরিক অধিকার রক্ষা গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা অঞ্চলে আবারও ক্ষমতার দাপট ও ভিআইপি সংস্কৃতির নগ্ন রূপ উন্মোচিত হয়েছে। হায়দ্রাবাদের তথ্যপ্রযুক্তি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত মাধাপুর এলাকায় ঘটে যাওয়া এক সড়ক দুর্ঘটনায় কর্মজীবী তরুণী ভারতী মুখির অকালমৃত্যু ভারতের আইনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও সাধারণ নাগরিকদের জীবনের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।ঘটনার বিবরণ ও মর্মান্তিক পরিণতি:
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ আগস্ট দুপুরে ভারতী মুখি তার সহকর্মী পূজা অশোককে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে আইটিসি কোহিনুর এলাকার দিকে যান। খাওয়া শেষে কর্মস্থল ইনঅরবিট মলের দিকে পায়ে হেঁটে ফেরার সময় সড়ক পার হওয়ার মুহূর্তে হঠাৎ অত্যন্ত বেপরোয়া ও অনিয়ন্ত্রিত গতিতে আসা একটি চার চাকার যানবাহন ভারতীকে সরাসরি সজোড়ে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় ভারতী ছিটকে পড়েন এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে ঘটনাস্থলেই তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে।দুর্ঘটনার পর অভিযুক্ত চালক এবং স্থানীয়রা গুরুতর আহত ভারতীকে উদ্ধার করে জুবিলি হিলসের অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।অভিযুক্তের পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব:
ঘটনার পর পুলিশি তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ঘাতক গাড়িটি চালাচ্ছিলেন সঞ্জুশ। তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং রাজ্যসভার সদস্য (এমপি) লিঙ্গামানেনি রমেশের ছেলে। এমপি লিঙ্গামানেনি রমেশ অন্ধ্রপ্রদেশের বর্তমান উপমুখ্যমন্ত্রী পবন কল্যাণের নেতৃত্বাধীন জনসেনা পার্টির রাজনীতিতে প্রভাবশালী একজন নেতা।ভারতীর সহকর্মী পূজা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শোরুমের ম্যানেজার অশ্বিন কুমারকে অবহিত করেন এবং পরবর্তীতে পুলিশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।আইনি শিথিলতা ও গ্রেপ্তার না করার বিতর্ক:
ঘটনার সময় ও পরিপার্শ্বিক তথ্য সত্ত্বেও অভিযুক্ত সঞ্জুশকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করেনি, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনমনে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ-ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণেই পুলিশ তাকে ছাড় দিচ্ছে।মাধাপুর এলাকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসিপি) চি শ্রীধর এক বক্তব্যে জানিয়েছেন যে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ১০৬(১) ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই ধারাটি বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যুর জন্য প্রযোজ্য, যা অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ডের (Culpable Homicide) অন্তর্ভুক্ত নয়। পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, এই ধারাটি জামিনযোগ্য এবং এতে সর্বোচ্চ সাজা সাত বছরের কম হওয়ায় আইনের নিয়ম অনুযায়ী অভিযুক্তকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করার বাধ্যবাধকতা ছিল না।মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ভারতের আইনি ব্যবস্থায় প্রতিনিয়তই দেখা যায় যে সাধারণ কিংবা সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যরা যখন এই ধরনের ভিআইপি চালকদের বেপরোয়া গাড়ির শিকার হন, তখন পুলিশী তদন্ত শ্লথ হয়ে যায় এবং জামিনযোগ্য হালকা ধারায় মামলা দিয়ে অভিযুক্তদের রক্ষার পথ সুগম করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ