প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
গাজায় হাজারো মানুষের সন্ধান নেই, জোরপূর্বক গুম শিকারের আশঙ্কা
আন্তর্জাতিক জোরপূর্বক গুমের শিকারদের দিবসের এক দিন আগে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে একটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংস্থা। শনিবার প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ তথ্য জানিয়েছে ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও জোরপূর্বক অন্তর্ধান কেন্দ্র। ৩১৭টি নথিভুক্ত মামলার নমুনা বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বলেছে, গাজায় নিখোঁজ ও জোরপূর্বক অন্তর্ধানের ঘটনা আরও ব্যাপক হতে পারে।প্রতি বছর ৩০ আগস্ট ‘জোরপূর্বক গুমের শিকারদের আন্তর্জাতিক দিবস’ পালিত হয়। দিবসটি সামনে রেখে ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও জোরপূর্বক অন্তর্ধান কেন্দ্র শনিবার জানায়, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি যুদ্ধের সময় জোরপূর্বক গুম হওয়া সন্দেহভাজন মানুষের সংখ্যা ২,৫০০ থেকে ৩,০০০-এর মধ্যে হতে পারে।এই মূল্যায়নটি কেন্দ্রটির পরিচালিত একটি বিশ্লেষণধর্মী সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। এতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া প্রতিবেদন এবং মাঠপর্যায়ে নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩১৭টি মামলার নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।কেন্দ্রটির মতে, এসব তথ্য গাজায় ঘটে যাওয়া সব নিখোঁজ বা জোরপূর্বক অন্তর্ধানের ঘটনা প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে নমুনার ফলাফল অঞ্চলটিতে জোরপূর্বক অন্তর্ধানের আরও ব্যাপক ও পদ্ধতিগত প্রবণতা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্তের দাবি রাখে।ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও জোরপূর্বক অন্তর্ধান কেন্দ্র গাজাভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা। নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য নথিভুক্ত করা, তাদের ভাগ্য অনুসন্ধান করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্থাটি কাজ করে।সমীক্ষায় নথিভুক্ত ৩১৭ জনের মধ্যে ৩০২ জন পুরুষ, যা মোট নমুনার ৯৫ দশমিক ২৭ শতাংশ। নারী ছিলেন ১৫ জন। একই নমুনায় ৪১ জন শিশু এবং ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৭ জন ব্যক্তিও ছিলেন।ভৌগোলিক হিসাবে গাজা গভর্নরেটে সর্বাধিক ৮৯টি নিখোঁজের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এরপর উত্তর গাজায় ৭৪টি, খান ইউনিসে ৫৯টি, মধ্য গাজা গভর্নরেটে ৩৭টি এবং রাফাহতে ৩২টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়।নিখোঁজ হওয়ার পরিস্থিতি বিশ্লেষণেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। ইসরায়েলি বাহিনীর বাড়িঘরে অভিযান এবং কোনো এলাকা অবরোধের সময় ৭৬টি ঘটনা ঘটেছে, যা নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে সর্বাধিক।এছাড়া বাড়িতে ফেরার চেষ্টা বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহের সময় ৬০ জন নিখোঁজ হন। বাস্তুচ্যুত হওয়ার সময় কিংবা সামরিক চৌকি অতিক্রম করার সময় ৪২টি ঘটনা এবং খাদ্যের সন্ধানে বা ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করার সময় ৩৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।কেন্দ্রটি চিকিৎসাকেন্দ্র অবরোধ বা জোরপূর্বক দখল এবং রোগী স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত ২২টি ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে। একইভাবে সাংবাদিকতা ও মাঠপর্যায়ের কাজের সময় ১০ জন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।তবে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টি জোরপূর্বক গুমের হিসাব থেকে আলাদা রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে কেন্দ্রটি। তাদের অনুমান অনুযায়ী, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষ নিখোঁজ থাকতে পারেন। এসব ব্যক্তিকে জোরপূর্বক গুমের শিকার বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।এর আগে গত এপ্রিল মাসে ফিলিস্তিনি বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ১১,২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে নিখোঁজ বা জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৪,৭০০-এর বেশি নারী ও শিশু রয়েছে বলে জানানো হয়।জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বা তাদের সমর্থন, অনুমোদন কিংবা সম্মতিতে কোনো ব্যক্তি গ্রেপ্তার, আটক বা অপহৃত হওয়ার পর তার স্বাধীনতা হরণের বিষয়টি অস্বীকার করা এবং তার ভাগ্য বা অবস্থান প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানানোকে জোরপূর্বক অন্তর্ধান বলা হয়।ফিলিস্তিনি নিখোঁজ ও জোরপূর্বক অন্তর্ধান কেন্দ্র গাজায় নিখোঁজ সব ব্যক্তির পরিণতি প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের কাছে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং জোরপূর্বক অন্তর্ধানের অভিযোগ তদন্তে একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।কেন্দ্রটি আরও বলেছে, এসব ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে কার্যকর তদন্ত প্রয়োজন।২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় সামরিক অভিযান শুরু করে। প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ওই যুদ্ধের সময় ৭৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১,৭৪,০০০-এর বেশি আহত হয়েছেন; নিহত ও আহতদের বড় অংশই নারী ও শিশু।গাজায় নিখোঁজ ও জোরপূর্বক অন্তর্ধানের এসব অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি রাখে। একই সঙ্গে নিখোঁজদের পরিবারগুলোর তাদের স্বজনদের ভাগ্য জানার অধিকার এবং আটক ব্যক্তিদের মানবিক ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ